Loading Now

আইন ও আদালত চলত আনিসুল হকের চেম্বারের হুকুমে

 

অনলাইন ডেক্স ।।

ফ্যাসিবাদী সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তার চেম্বারের জুনিয়রদের দাপট ছিল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত। তাদের পছন্দ না হলে হাইকোর্টও রায় পরিবর্তন করত। এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো তোয়াক্কাই ছিল না। আনিসুল হকের চেম্বারের চাহিদা বলে কথা! তাদের চাওয়াটাই ছিল আইন।

আনিসুল হক ও তার চেম্বারের জুনিয়ররা যেভাবে চাইতেন, বিচার বিভাগের প্রতিটি স্তরে রায় আসত তাদের মতো করেই। ব্যতিক্রম হলে রায় ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে খোদ হাইকোর্ট বিভাগে। বাংলার বিখ্যাত প্রবাদ ছিল ‘হাকিম নড়বে, তবুও হুকুম নড়বে না’। এই প্রবাদকে হার মানিয়েছে আনিসুল হকের জুনিয়রদের দাপট ও ফ্যাসিবাদ অনুগত বিচারকরা। শুধু কি প্রবাদবাক্যকে হার মানিয়েছেন তারা? সিআরপিসি বা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৯ ধারা লঙ্ঘন করে অন্তর্বর্তী আদেশ পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুগত বিচারকরা নিজেদের পদ-পদবির অপব্যবহার করেছেন ফ্যাসিবাদের আইনমন্ত্রীকে খুশি রাখতে। এই কর্মের মাধ্যমে আনিসুল হকের জুনিয়ররা হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। সাবেক আইনমন্ত্রীর ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করেন তওফিকা করিম। জেলা আদালতের অনুগত বিচারকরা হয়েছেন নানাভাবে পুরস্কৃত। কেউ ঢাকায় পোস্টিং ধরে রেখেছেন, কেউ পদোন্নতি পেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন।

তাদের দাপটের নমুনা দেখতে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একটি মামলার কেসস্টাডি পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো। এতে দেখা যায়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট নজিরবিহীনভাবে জামিন দেয় মোটা দাগে মানিলন্ডারিং মামলার আসামিদের। এর আগে এ ধরনের মামলায় সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে জামিনের ঘটনা অতীতে খুব একটা ঘটেনি। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এখতিয়ারের বাইরে ছিল এ জামিন। এই আদেশের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আপিল করেছিলেন প্রতিপক্ষ। এখানেও আনিসুল হকের চেম্বারের দাপট! রিভিশন আপিল খারিজ করে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের আদেশ বহাল রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিকার চাইতে হাইকোর্ট বিভাগে আসেন প্রতিপক্ষ। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগেই ঘটে মজার খেলা।

যা ঘটেছে হাইকোর্টে

ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ারবহির্ভূত নজিরবিহীন জামিনের আদেশ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ। শুধু বিস্ময় প্রকাশ বললে হয়তো কম বলা হবে, কেন ওই ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস ইস্যু করা হয় হাইকোর্ট থেকে। বলা হয় ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে সশরীরে এসে হাজির হয়ে এই কারণ দর্শাতে হবে। একই সঙ্গে জামিন দেওয়া আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। এজন্য দুই সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়। পরদিন জাতীয় আওয়ামী পত্রিকাগুলোতেও ফলাও করে এ ঘটনার শিরোনাম করা হয়েছিল।

হাইকোর্টের এই আদেশ দেখে প্রতিপক্ষ তখন মনে করেছিল এবার হয়তো বিচার পাবেন। হাইকোর্টের এই আদেশ অনুযায়ী এখতিয়ারবহির্ভূত জামিন দেওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের শাস্তি হবে। আসামিরা আত্মসমর্পণ করে আবার কারাগারে যাবেন। এটাই ছিল হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা। কিন্তু সেই আদেশ টেকেনি। হাকিমরা নিজের চেয়ার ধরে রাখতে হুকুম পরিবর্তন করেছেন। খোদ হাইকোর্টের সেই বেঞ্চ আদেশ পরিবর্তন করে মাত্র ১২ দিনের মাথায়। পরিবর্তিত আদেশ আসে আইনমন্ত্রীর জুনিয়রদের চাহিদা অনুযায়ী।

 

মামলাটির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঘটনাটি ছিল ১৮ কোটি ৯৭ হাজার ৪২৫ টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ। খোদ সিআইডি অনুসন্ধান করে এই মামলাটি দায়ের করেছিল। ঢাকার সিএমএম আদালতের জিআর মামলা নং ৩৯ (তারিখ ২৮/০২/২০২১) থেকে এ ঘটনার উৎপত্তি।

১নং ও ২নং আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার ১০ দিনের মাথায় জামিন মঞ্জুর করেন ঢাকার সিএমএম কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রত শিকদার। তখন ঢাকার সিএমএম ছিলেন জুলফিকার হায়াত। পুরস্কার হিসেবে কিছুদিনের মধ্যেই আমেরিকা সফরের সুযোগ পান তিনি। ঢাকায় পুনরায় পোস্টিংও পান। এই জুলফিকার হায়াতই বর্তমান শিল্প ও গণপূর্ত উপদেষ্টা এবং অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানকে সরকারের ফরমায়েশি রায়ে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।

সিএমএম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন প্রতিপক্ষ। দায়রা জজ আদালতে ক্রিমিনাল মিস কেস নং ৬০১২/২০২১। তখন মহানগর দায়রা জজ ছিলেন ইমরুল কায়েস। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বহাল রাখেন। অর্থাৎ এখতিয়ারবহির্ভূত জামিন বহাল রাখেন মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েস। পুরস্কার হিসেবে কিছুদিনের মধ্যেই তাকে পদোন্নতি দিয়ে নেওয়া হয় হাইকোর্ট বিভাগে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে আসামিপক্ষে আইনজীবী ছিলেন আনিসুল হকের চেম্বারের জুনিয়র অ্যাডভোকেট বাহার ও আওয়ামী ক্যাডার হিসেবে খ্যাত নজিবুল্লাহ হিরু। মামলাটির মূল তদ্বিরকারী ছিলেন আনিসুল হকের অতিঘনিষ্ঠ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত তার চেম্বারের জুনিয়র অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম। ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর ফৌজিয়া করিম দেশ ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান।

যেভাবে পরিবর্তন হয় হাইকোর্টের আদেশ

দায়রা জজ আদালতের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল রিভিশন মামলা নং ২৩৩০/২০২১ দায়ের করেন প্রতিপক্ষ। মামলার নথিপত্র দেখে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারক একেএম জহিরুল হক বিস্ময় প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রতকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর রুল জারি করা হয়। আসামিদ্বয়কে দুই সপ্তাহের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে কারাগারে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় একই আদেশে।

এই নির্দেশনার পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে ফৌজিয়া করিমের নেতৃত্বে আনিসুল হকের চেম্বারের সিন্ডিকেট। তারা হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ ও নির্দেশনা রিকলের জন্য আবেদন করেন। ২০২১ সালের ২২ নভেম্বর আদেশ ও নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট। আনিসুল হকের চেম্বারের সিন্ডিকেটের তৎপরতায় ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর রিকল আবেদনের শুনানি করে রায় পরিবর্তন করে দেন একই বেঞ্চের বিচারকদ্বয়। যদিও ফৌজদারি দণ্ডবিধির সেকশন ৩৬৯-এ স্পষ্ট করেই উল্লেখ রয়েছে- আদালতে আদেশ হয়ে যাওয়ার পর ক্লারিকেল ভুল ছাড়া মূল নির্দেশনা বা রায়ে পরিবর্তন করা যাবে না। একাধিক মামলার রায়ে কেস ল-এ বিচারকরা পরিবর্তনের এখতিয়ারের বিষয়ে ব্যাখ্যাও করেছেন। এতে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, ক্লারিকেল ভুল ছাড়া মূল আদেশে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। আইন ও হাইকোর্ট বিভাগের কেইস ল’ রেফারেন্স অনুযায়ী রিকল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্লারিকেল ভুল সংশোধন করা গেলেও মূল রায় বা আদেশে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অথচ এই মামলায় মূল আদেশ পরিবর্তন করা হয়েছে রিকল আবেদন মঞ্জুর করে।

আম-ছালা দুটোই হারিয়েছে আপিল বিভাগ

হাইকোর্ট বিভাগে অন্তর্বর্তী আদেশ পরিবর্তনের পর প্রতিপক্ষ প্রতিকার চাইতে আপিল বিভাগের কাছে গেলেন। এখানেও আনিসুল হকের সিন্ডিকেটের দাপট। আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল নং ২১৪/২০২২ শুনানি করে প্রতিকার তো অনেক দূরের বিষয়, হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা আবেদনটিও খারিজ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বিষয়টি হাইকোর্টেও শুনানির অবকাশ রাখা হয়নি। যদিও রিকল আবেদনের পর আদেশে মৌলিক নির্দেশনাগুলো পরিবর্তনে শুধু কারণ দর্শানোর রুল শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। এই রুলটিও আপিল বিভাগ খারিজ করে দেয়। অথচ আপিল বিভাগে মূল আবেদন ছিল একবার আদেশ দেওয়ার পর রিকল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলিক নির্দেশনা পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করে।

ফ্যাসিবাদ অনুগত আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতির আসনে ছিলেন তখন হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ আরও একধাপ এগিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের চেম্বারকে খুশি করতে চেয়েছে। হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর আপিল বিভাগ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের জামিন বহাল রাখে এবং উল্টো জামিনের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা পুরো আবেদনটি বাতিল করে দেয়। হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গে ছিলেন নুরুজ্জামান, ওবায়দুল হাসান, বোরহান উদ্দিন, ইনায়েতুর রহিম ও কৃষ্ণা দেবনাথ। এটিও একটি নজিরবিহীন ঘটনা। আবেদনকারী হাইকোর্ট বিভাগের রিকল করা আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়েছিলেন আপিল বিভাগে; অথচ তার আবেদন খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন বিষয়টিও নিষ্পত্তি করে দেয়। এতে আপিল করে বিচারপ্রার্থীর আম-ছালা সবই যায়। যদিও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে তার আবেদনে কোনো কিছুই বলা হয়নি। বলা হয়েছিল রিকল করে দেওয়া আদেশটি নিয়ে। যে বিষয়টি আপিল বিভাগের বিচার্য ছিল না, তাও স্বপ্রণোদিত হয়ে বাতিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফ্যাসিবাদের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের চেম্বারের পক্ষে মূল তদ্বিরকারী ছিলেন তৌফিকা করিম সিন্ডিকেট। বিচার বিভাগে এই সিন্ডিকেটের দাপট ছিল সর্বত্র। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে শুরু করে আপিল বিভাগ পর্যন্ত ছিল তার দাপট। তাদের দাপটের কাছে আইন ছিল অসহায়। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠজনদের হাইকোর্টে আর দেখা যায় না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED