ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় জিম্ম, অতঃপর
আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি ।।
উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন পূরণে জমি বিক্রি, ঋণ আর ধারদেনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। বরিশালের আগৈলঝাড়ার একদল যুবক ইতালিতে কাজের আশায় দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে এখন মানবপাচারের শিকার।
ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের যাত্রা থেমে যায় লিবিয়াতে।
সেখানে গিয়ে তারা জিম্মি হন, সহ্য করেন অমানবিক নির্যাতন, এমনকি মুক্তিপণের জন্য হুমকির মুখেও পড়তে হয় পরিবারকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বৈধ ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে ইতালিতে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়। সেই প্রলোভনে পড়ে অনেকে জমি বিক্রি করে, আবার কেউ ঋণ নিয়ে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালদের দেন।
এই অর্থ পাঠানো হয় পূবালী ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক-এর বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে।
ভুক্তভোগী মেহেদী হাসানের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। তাঁকে প্রথমে সৌদি আরব, পরে মিশর হয়ে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে না খাইয়ে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এখানেই শেষ নয় প্রায় দেড় মাস বন্দী রাখা হয় বেনগাজির একটি কারাগারে।
পরে তাকে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে মুক্তির জন্য দাবি করা হয় আরও ৮ লাখ টাকা। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত পরিবার ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করলে তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
স্থানীয়দের মতে, বরিশালের আগৈলঝাড়া ও গৌরনদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকেই দালাল চক্রের মাধ্যমে ‘বডি কন্ট্রাক্টে’ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিরাপদ ও বৈধ পথ এড়িয়ে যাওয়ায় মাঝপথেই অনেকেই মানবপাচারের ফাঁদে পড়ে নিখোঁজ বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কাজের প্রলোভনে দালালের মাধ্যমে যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা জীবননাশের কারণও হতে পারে।
সম্প্রতি বরিশালে ভুক্তভোগী মেহেদী হাসান খান বাদি হয়ে মানবপাচার, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৩৪ জনকে আসামি করে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন জামাল মোল্লা, তাঁর দুই ছেলে (যারা বর্তমানে ইতালি-তে অবস্থান করছেন) এবং তাঁর দুই শ্যালক। ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন অনেকেরই থাকে, কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন দালালদের ফাঁদে পড়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয় সেজন্য সচেতনতা ও কঠোর আইন প্রয়োগই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



Post Comment