কালেমা পড়ে আত্মহত্যাকারী কি জান্নাতি?
অনলাইন ডেক্স ।।
কালেমা পড়ে আত্মহত্যাকারী কি জান্নাতি?
অনলাইন ডেক্স ।।
মুসলিম সমাজে একটি সংবেদনশীল ও বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো— কেউ যদি কালেমা পড়ে, মুসলমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে; কিন্তু সে যদি আত্মহত্যা করে, তবে তার পরিণতি কী? সে কি জান্নাতে যাবে, নাকি চিরস্থায়ী জাহান্নামের অধিবাসী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়; বরং কুরআন, হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামিক স্কলারদের ব্যাখ্যার আলোকে বুঝতে হবে।
১. আত্মহত্যা সম্পর্কে কুরআনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা
আত্মহত্যা ইসলামে মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)। কুরআনের নির্দেশ—
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২৯)
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে আরও বলেন—
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
‘নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)
কুরআনুল কারিমের এসব আয়াত আত্মহত্যার বিষয়টি সুস্পষ্ট করে যে— আত্মহত্যা হারাম এবং আল্লাহর রহমতের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর অপরাধ।
২. আত্মহত্যাকারীর পরিণতি
হাদিসে পাকে আত্মহত্যাকারীর পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে—
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ عُذِّبَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি যেভাবে আত্মহত্যা করবে, কেয়ামতের দিন তাকে সেই উপায়েই শাস্তি দেওয়া হবে।’ (বুখারি ৫৬২১, মুসলিম ২০৩ ইফা)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
كَانَ بِرَجُلٍ جُرْحٌ فَقَتَلَ نَفْسَهُ، فَقَالَ اللَّهُ: بَادَرَنِي عَبْدِي بِنَفْسِهِ، حَرَّمْتُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
‘এক ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নিজেই নিজেকে হত্যা করল। আল্লাহ বললেন: আমার বান্দা নিজের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করল, তাই আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি ১৩৬৪, ৩৪৬৩)
৩. তাহলে প্রশ্ন—কালেমা পড়া মুসলিম কি কাফির হয়ে যায়?
গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত প্রশ্ন এটি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত মত হলো— আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ, কিন্তু কুফর নয়। অর্থাৎ, আত্মহত্যাকারী ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না, যদি সে—
> আত্মহত্যাকে হালাল মনে না করে
> আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অস্বীকার না করে
৪. ইসলামিক স্কলারদের মতামত
> ইমাম নববী (রহ.) বলেন— ‘আত্মহত্যাকারী কাফির নয়। সে গুরুতর গুনাহগার। সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন— চাইলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন।’ (শরহে মুসলিম)
> ইমাম আহমদ (রহ.) বলেন— ‘তার জানাজা পড়া হবে, তাকে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে, কিন্তু তার গুনাহ অত্যন্ত ভয়াবহ।’
> ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন— ‘আত্মহত্যাকারী মুসলিম হলেও সে জাহান্নামের শাস্তির উপযুক্ত। তবে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়।’ (মাজমু ফাতাওয়া)
৫. তাহলে কি সে জান্নাতি?
কালেমা পড়া আত্মহত্যাকারীকে নিশ্চিতভাবে যেমন জান্নাতি বলা যাবে না। আবার চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলাও আহলুস সুন্নাহর আকিদা নয়। তার পরিণতি নির্ভর করে— তার ঈমানের অবস্থার ওপর; তার মানসিক অবস্থার ওপর (চাপ, অসুস্থতা, বাধ্যতা); আল্লাহর রহমত ও বিচারের ওপর। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শিরককে ক্ষমা করেন না; কিন্তু শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪৮)
তবে এ কথা সুনিশ্চিত যে, আত্মহত্যা শিরক নয়, তাই ক্ষমার সম্ভাবনা রয়েছে।
৬. আমাদের করণীয় কী?
আত্মহত্যাকে কখনো হালকা বা ‘মুক্তি’ হিসেবে দেখানো যাবে না
মানসিক কষ্টে থাকা মানুষকে সাহায্য করা ফরজ দায়িত্ব
আত্মহত্যাকারীর জন্য দোয়া করা যাবে কিন্তু তাকে নিশ্চিত জান্নাতি ঘোষণা করা যাবে না
ইসলাম জীবনের ধর্ম। আল্লাহ মানুষকে বিপদে ধৈর্য ধরতে, সাহায্য চাইতে এবং আশাহত না হতে বলেছেন। কালেমা পড়া সত্ত্বেও আত্মহত্যা করলে মানুষ মুসলিমই থাকে, কিন্তু সে এক ভয়ংকর গুনাহের বোঝা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। তার পরিণতি আল্লাহর বিচার ও রহমতের ওপর ন্যস্ত— আমাদের দায়িত্ব বিচার করা নয়, বরং শিক্ষা নেওয়া, মানুষকে বাঁচানো এবং আল্লাহর রহমতের দিকে আহ্বান করা। আল্লাহ বলেন—
وَ لَا تَایۡـَٔسُوۡا مِنۡ رَّوۡحِ اللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ لَا یَایۡـَٔسُ مِنۡ رَّوۡحِ اللّٰهِ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡكٰفِرُوۡنَ
‘আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, কেননা কাফির কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না’। (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৭)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।
তথ্য সূত্র : যুগান্তর,,,



Post Comment