গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের আলোকে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কারের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ কর্তৃত্ব, জনবল, আর্থিক সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে স্থানীয় জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হয়। বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো অত্যন্ত প্রকট। সংসদ সদস্য-উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-ইউএনও এ ত্রিমুখী টানাপোড়েনে উপজেলা পরিষদ যথাযথ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারছে না। আইনে উল্লেখ থাকলেও হস্তান্তরিত কার্যক্রমগুলো এখনও উপজেলা পরিষদের কাছে যথাযথভাবে ন্যস্ত করা হয়নি। জেলা পরিষদের কাজ কী, জেলার মানুষের কোন উপকারে তারা পাশে থাকেন এ সম্পর্কে কারোরই কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। সার্বিক সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কেই জেলা পরিষদে পরিণত করা দরকার। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও পৌরসভা এলাকার উন্নয়ন কর্মকা-েও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের ‘পরামর্শ’ উপেক্ষা করা যায় না। সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ‘নগর সরকার’ গঠনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। ২ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকাল ১০টায় বরিশালের গ্রান্ড পার্ক হোটেলে এসডিসি’র সহযোগিতায় গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ও ইউএনডিপির যৌথ আয়োজনে ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনআকাক্সক্ষার আলোকে স্থানীয় সরকার সংস্কার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে বক্তারা এসব বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনডিএনের সভাপতি ও আইসিডিএর উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার জাহিদ। গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের সচিবালয় ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমার সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফোরামের সদস্য সংগঠন গভার্নেন্স কোয়ালিশনের প্রতিনিধি মো. নজরুল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের ফ্যাসিলিটেটর অনিরুদ্ধ রায়। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন এমএপির নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর চক্রবর্তী। বিভাগীয় সংলাপে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বর্তমান ও সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, নারী, পেশাজীবী, গণমাধ্যম কর্মী, উন্নয়ন কর্মী, সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, যুব প্রতিনিধি, ছাত্র প্রতিনিধি, গৃহবধূ, এনজিও সংগঠিত দলের নেত্রী, শিক্ষক, স্থানীয় ক্লাব, ধর্মীয় নেতা, দলিত, হিজড়া, অতিদরিদ্রসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম বলেন, গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ২০০৭ সাল থেকে প্রায় পঞ্চাশটির অধিক সংগঠন নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার বিষয়ে এডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ২০০৭ সালে কনভেনশনের মাধ্যমে ফোরাম যে ৪০ দফা দাবিনামা উপস্থাপন করে তার বেশিরভাগই পরবর্তীতে প্রণীত আইনগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার কমিশন কার্যকর না করা এবং সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা রাখার বিধানের ফলাফল ভালো হয়নি। এ ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার উদ্যোগে সহায়তা করার জন্যই ফোরামের এ প্রয়াস।
অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর সাথে একমত পোষণ করে যেসব সুপারিশ ও মতামত তুলে ধরেন সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন না করে সরাসরি ও দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা; জনপ্রতিনিধিদের সক্ষমতা ও সম্মানী বৃদ্ধি করা; জনসংখ্যা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আয়তন ইত্যাদি বিবেচনায় উন্নয়ন বরাদ্দ সরাসরি স্থানীয় সরকার পরিষদে প্রদান করা; স্থানীয় সরকার কার্যক্রমে যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা; কর-বৈষম্য দূর করা ইত্যাদি।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অনিরুদ্ধ রায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ছয় ধরনের সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জ মোটাদাগে চিহ্নিত করেন সেগুলো হলো: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অভাব ও দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, জেন্ডার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সীমিত সুযোগ। এ প্রেক্ষিতে যেসব সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় সেগুলো হলো: স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও দায়িত্ব বিভাজন প্রস্তাবের অধীনে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের ৯টি ওয়ার্ড জনসংখ্যা অনুপাতে ১২টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা; উপজেলা পরিষদে সংসদসদস্যদের উপদেষ্টার ভূমিকা সম্বলিত বিধান বাতিল করা; সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা ও দায়-দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা; জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে রূপান্তর করা এবং জেলা পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবেন একজন জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার ক্যাডার সার্ভিস চালু করা ইত্যাদি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন প্রস্তাবের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে আয়োজন করা ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; কাছাকাছি সময়ে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; সকল স্তরে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা ইত্যাদি। কর-রাজস্ব ব্যবস্থার স্থানীয়করণ প্রস্তাবের মধ্যে স্থানীয় সরকারের মডেল ট্যাক্স শিডিউল হালনাগাদ করা; আঞ্চলিক বৈষম্য ও অসমতা দূর করতে জাতীয় বাজেটে সকল স্তরের স্থানীয় সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট ’বাজেট বন্টন কাঠামো’ তৈরি করা, ম্যাচিং গ্রান্টের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত পরিষদের কাছে তাদের আওতাধীন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কার্যক্রম মনিটরিং, বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এপিআর) লেখা কার্যকর করা এবং ই-গভার্নেন্স ব্যবস্থা ও ওয়েবভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থার প্রচলন করা; স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকা-ে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্তের
অনুলিপি ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। স্থানীয় উন্নয়নের সকল স্তরে জনঅংশগ্রহণ ও তৃণমূল মানুষের অন্তর্ভুক্তি শীর্ষক প্রস্তাবনায় স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গ-বয়স-প্রতিবন্ধিতা-জাতি-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ও অধিকসংখ্যক নাগরিক ও যুব প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরীক্ষার পদ্ধতিসহ ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট, ইত্যাদি কার্যক্রমে জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অধীনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি নিবেদিত গবেষণা, ডকুমেন্টেশন ও নীতি তথ্য ভান্ডার স্থাপন করা; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এনআইএলজির কাজের পরিধি বৃদ্ধি ও বিকেন্দ্রীকরণ করা; উপরিউক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সরকারের আর্থিক মঞ্জুরি, অডিট, তদারকি ও মনিটরিংসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্য-পরিধি নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়নের জন্য অবিলম্বে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন ও কার্যকর করা ইত্যাদি।
Post Comment