Loading Now

বর্জ্যের বিষে নীল পায়রা নদী, বিপন্ন প্রতিবেশ

 

বরগুনা প্রতিনিধি ।।

বরগুনার আমতলী পৌর শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, ময়লা ও আবর্জনা ফেলা হচ্ছে পায়রা নদী ও বাসুগী খালে। পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য ফেলার কারণে নদী ভরাট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে নদী ও নদী তীরবর্তী এলাকার পরিবেশ। চারপাশের দুর্গন্ধময় বাতাসে দমবন্ধের উপক্রম স্থানীয়দের। পাশাপাশি নদীর পানি ব্যবহার করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। এতে ওই এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

বরগুনা ও আমতলীর মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত পায়রা নদী। প্রমত্তা পায়রার সঙ্গে যুক্ত বাসুগী খাল। প্রবহমান পায়রা নদী ও খাল ঘিরে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বেসরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বাজার।

 

জনগুরুত্বপূর্ণ এ পৌর শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সংগ্রহ করে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডসংলগ্ন ব্লকে পায়রা নদীতীর ঘেঁষে এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাছ বাজারের পশ্চিম পাশে বাসুগী খালের পাড়ে ফেলছেন। এসব বর্জ্য নদী খালের পানিতে মিশে দূষণ বাড়াচ্ছে। ফলে পায়রা নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এসব ময়লা নদীর স্রোতে ভেসে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত তিন দশকে পৌরসভার উন্নয়নে শতকোটি টাকা ব্যয় হলেও বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণ করেনি পৌর কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৩ আগস্ট আমতলী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সালে এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় ৩৩ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। পৌর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ টন বর্জ্য তৈরি হয়।

এ বিষয়ে কথা হলে পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, বর্তমানে পৌরসভায় কোনো ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়েছিল। বরাদ্দ না পাওয়ায় সে প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডসংলগ্ন ব্লকে পায়রা নদীতীর ঘেঁষে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ময়লা ফেলছেন। সেখানে রয়েছে হাসপাতাল, বাজার ও ছোটখাটো কারখানার বর্জ্য। তীরসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারাও যে যার মতো গৃহস্থালির আবর্জনা ফেলছে। কাক, মুরগি, কুকুর সেগুলো ঘাটাঘাটি করছে। দুর্গন্ধে এলাকায় টেকা দায়। বর্জ্য নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এতে পায়রা নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানি এখন বিষে পরিণত হয়েছে। সেই পানি গোসল, রান্নাসহ নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করছেন অনেকে।

একইভাবে ময়লা ফেলা হচ্ছে বাসুগী খালেও। পলিথিন, চিপস, বিস্কুটের খোসা ভাসছে খালের পানিতে। হাসপাতালে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, কাচের বোতলসহ নানা ধরনের ক্লিনিক্যাল বর্জ্য দেখা গেছে সেখানে। শুধু পায়রা বা বাসুগী খাল নয়; ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষি রোডের পূর্ব পাশের ডোবা, সাত ধারা, খোন্তাকাটা, সবুজবাগ, একে স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক ঘেঁষে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৫ সালে আওয়ামী সরকারের আমলে এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে ঘোষিত হলেও বর্জ্য অপসারণের নির্ধারিত কোনো জায়গার ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি পৌর কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সময়ে পৌরসভার উন্নয়নে শত কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হলেও পৌরসভা থেকে ময়লা ফেলানোর নির্ধারিত জায়গা তৈরি না করায় সাবেক মেয়রকে দায়ী করছেন পৌর বাসিন্দারা।

আমতলী পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন চা দোকানি লাইলী বলেন, ‘আগে আমাদের এখানে অনেক লোক ঘুরতে আসতো, তাই দোকান দিয়েছিলাম। বেশ কিছুদিন পৌরসভার সব ময়লা এই নদীর পাশে এনে ফেলা হচ্ছে। দুর্গন্ধে এখানে বসবাস করাই কষ্টকর। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নাই তাই বাধ্য হয়ে এখানে থাকছি। এই নদীর পানি আমাদের ব্যবহার করতে হয়। সেটাও এখন দূষিত হয়ে গেছে। এর ফলে আমাদের পরিবারের সবাই পেট খারাপ, শ্বাসকষ্টসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছি।’

 

পায়রা নদী তীরবর্তী গাছ বাজারের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, গাঙ্গের পানি দিয়া মোরা নাওয়া রান্দাসহ সব কাজ হরি। পানি নষ্ট অইয়া যাওয়ায় নাওনের পর গা খালি চুলকায়।

লঞ্চঘাট এলাকার জেলে রাজু খাঁ বলেন, পায়রা নদীতে একসময় ইলিশ, পাঙাশ, পোয়া, তপসী, গলদা চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্জ্যের কারণে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। অনেক জেলে মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।
আক্ষেপ করে জেলে নিজাম খাঁ বলেন, পানি নষ্ট হয়ে গেছে। আগের মতো মাছ পাই না। ইলিশ, পাঙাশ ও তপসী মাছ নাই বললেই চলে। সারাদিন বড়শি নিয়ে বসে থাকলেও মাছ পাওয়া যায় না।

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অধ্যাপক (অব.) আনোয়ার হোসেন আকন বলেন, জনস্বার্থে দ্রুত বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা প্রয়োজন। তা না হলে পৌরসভা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে।

পায়রা নদী রক্ষায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমতলীর স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভায় বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় সব ময়লা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নদীও দূষণ হচ্ছে। এর ফলে নদীতে মাছের আধিক্য কমে গেছে। এই নদীর উপকূলের লোকজন এই পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই দ্রুতই যেন পায়রা নদী বাঁচাতে পৌরসভার জন্য একটি বর্জ্য শোধনাগার তৈরি করা হয়।’

নদী দূষণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মী এইচ এম রাসেল বলেন, ‘পৌরসভার বয়স ২৬ বছর। এর মধ্যে আগের কর্তৃপক্ষ একটি বর্জ্য শোধনাগার করতে পারেনি। পৌরসভার যত বর্জ্য সব এনে এই নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। এতে এলাকার মানুষ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি নদী দূষণের সঙ্গে মৎস্য সম্পদও হুমকিতে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমতলীতে ঘোরার কোন জায়গা না থাকায় প্রতিদিন বিকেলে এখানে অনেক মানুষ ঘুরতে আসতো। এখন সেটাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।’

পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বর্জ্য ব্যস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা জমা দেওয়া আছে। টাকা পেলেই কাজ শুরু করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বরগুনার সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব বলেন, নদীর পানি ও পরিবেশদূষণ ময়লা ব্যবস্থাপনা জরুরি। পৌরসভাকে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক ও বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘প্রত্যেক পৌরসভায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র থাকতে হয়। বরগুনা সদর ছাড়া অন্য পৌরসভাগুলোতে সেটি নেই। আমরা দ্রুতই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি ক্রয় বা অধিগ্রহণ করে পৌরসভার নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ নেবো।

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED