বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ৬ প্রকল্পের দরপত্রে অস্বাভাবিক ব্যয় বরাদ্দের অভিযোগ
বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি ।।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ পৌরসভায় ছয়টি প্যাকেজের উন্নয়ন কাজের জন্য আহ্বান করা দরপত্রে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। মোট ব্যয় প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি হলেও এর মধ্যে খোদ পৌরসভা ভবন ও সংশ্লিষ্ট সড়ক উন্নয়নেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা।
কাজের ধরন ও পরিসরের তুলনায় এসব ব্যয় অযৌক্তিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় ছয়টি প্যাকেজে এসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
দরপত্র বিক্রয়ের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ এপ্রিল।
দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডে পৌরসভা ক্যাম্পাসে ইউনিব্লক সড়ক ও প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৪০ হাজার ১৫২ টাকা।
একই ভবনের কনফারেন্স ও অফিস কক্ষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮৮ টাকা। এছাড়া ভবনের ছাদে টাইলস বসাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ লাখ ৪৯ হাজার ১২১ টাকা।
এ তিনটি কাজ মিলিয়ে পৌর ভবন কেন্দ্রিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা।
এছাড়া পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডে সাহেবগঞ্জ বেড়িবাঁধ সড়কের পাশে ১০টি বেঞ্চ স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ১৭ হাজার ২২৭ টাকা। বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতিটি বেঞ্চে ব্যয় প্রায় ৪১ হাজার ৭২৩ টাকা। অন্যদিকে, পৌরসভার ১ থেকে ৯ নং ওয়ার্ডে ৫০টি রাস্তার বাতি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি বাতি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার ৭৯২ টাকা। একই সঙ্গে বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের জন্য অপেক্ষা কক্ষ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৩ টাকা।
সাবেক কাউন্সিলার ও পৌর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলিম জোমাদ্দার বলেন, পৌর ভবনের জন্য নেওয়া তিনটি কাজই অপ্রয়োজনীয়। পৌর ভবনে প্রবেশের রাস্তাটি ভালো আছে। ছাদেও টাইলস দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র ৩০০ বর্গফুটের দুটি কক্ষ সাজাতে ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা অস্বাভাবিক।
পৌরসভার এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুনেছি পৌর প্রশাসক ও প্রকৌশলীর বদলির প্রেক্ষাপটে এটি তাদের শেষ দিকের কাজ হওয়ায় এমনটা করেছে। না হয় এত ব্যয় পৌরসভার কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে আগে কখনো দেখিনি।
পৌর বিএনপির ৪ নং ওয়ার্ড সভাপতি জামাল হোসেন বিপ্লব বলেন, পৌর ভবনে এসি বসানো ছাড়া তেমন কোনো কাজের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া যেখানে পৌরসভার অধিকাংশ রাস্তার বেহাল দশা, সেখানে পৌর ভবনের নামেমাত্র উন্নয়নের জন্য ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া অস্বাভাবিক। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
পৌর ঠিকাদার সোহাগ বলেন, দরপত্রের বরাদ্দ ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। মাত্র ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট ছাদে টাইলস বসাতে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা লাগতে পারে, সেখানে সাড়ে ১১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পৌর ভবনের দুটি কক্ষ সাজাতে ৪৩ লাখ টাকাও ব্যয় বরাদ্দ রাখা অযৌক্তিক।
সচেতন নাগরিক ফজলুর রহমান মোল্লা বলেন, নতুন বাংলাদেশে এমন হওয়ার কথা নয়। এখনই এগুলো বন্ধ না হলে লুটপাট আরও বেড়ে যাবে। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও তার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সচেতন নাগরিকদের মতে, ছোট পরিসরের কাজেও বেশি ব্যয় দেখানোয় প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা দরপত্র প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দীন বলেন, প্রাক্কলন অনুযায়ী এবং বাজারদর বিবেচনা করেই ব্যয় নির্ধারণ করার কথা। তারপরও এ বিষয়টি যিনি প্রাক্কলন তৈরি করেছেন, তিনি ভালো বলতে পারবেন। প্রাক্কলন না দেখে আমি কিছু বলতে পারব না।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, পৌরসভার ছয়টি প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টি আমার কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। আমি বলেছি যাতে অস্বাভাবিক কিছু না হয়। আর বিষয়টি আমার দেখার কথা নয়। কাজে বরাদ্দের বিষয় দেখেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তিনি এ বিষয়ে বলতে পারবেন। আর অস্বাভাবিক হলেও এখন আর আমার কিছু করার নেই।



Post Comment