বাহাউদ্দিন গোলাপের ছোটগল্প ‘শত্রুহীন দহন’
( উৎসর্গ: প্রিয়জনের দেয়া বিষাক্ত অবিশ্বাসে নীল হয়ে যাওয়া সেইসব মানুষদের জন্য—যাঁরা প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরই যন্ত্রণার ব্যবচ্ছেদ করেন এবং এক চিলতে মিথ্যে হাসি মেখে দিনের আলোয় বেঁচে থাকার অভিনয় চালিয়ে যান।আর বিশেষ করে সেই ‘প্রতিমা’দের জন্য, যাঁদের নির্বিকার বদলে যাওয়া এক একটি জীবনকে একেকটি বিবাগী মহাকাব্যে রূপান্তর করে দেয়।)
📌 মানুষের মন কি কোনো জ্যামিতিক নকশা মেনে চলে? সম্ভবত না। চললে একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষের সমান্তরালভাবে দুই ভিন্ন গোলার্ধে হারিয়ে যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক হিসাব থাকত নিশ্চয়ই। কিন্তু জীবনের এই বিচ্ছেদগুলো কোনো উপপাদ্য মেনে চলে না বলেই তারা এতটা ব্যাখ্যাতীত। প্রতিমার সাথে সেই শেষ কথোপকথনটি ছিল আসলে একটি জীবন্ত সম্পর্কের নির্দয় পোস্টমর্টেম। বিষণ্ণ বাতাসের প্রতিটি ভাঁজে মিশে ছিল এক অমোঘ বিচ্ছেদ; ওর একেকটি নির্লিপ্ত কথা যেন তীক্ষ্ণ বিষাক্ত তীর হয়ে আমার বুকের গহীনে বিঁধছিল, আর আমি সেই অদৃশ্য রক্তক্ষরণে নীল হয়ে গিয়েছিলাম।
আমাদের সম্পর্কের নিউক্লিয়াসে ছিল ‘অন্ধ বিশ্বাস’। ধারণা ছিল, সাগরের জল শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেলেও প্রতিমার সত্যবাদিতার ভিত কখনো নড়বড়ে হবে না। একদিন গোধূলিকালে বুড়িগঙ্গার তীরে বসে ওর আঙুলের ডগা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“প্রতিমা, এই যে তুমি আমার হাত ধরে আছো, এটা কি স্পর্শ নাকি এক ধরনের ভরসা?”
চারপাশ তখন দিনের বিদায়ী আলোয় নদীর জল তামাটে হয়ে এসেছে। ওপারের গাছপালার ছায়াগুলো দীর্ঘ হতে হতে যেন আমাদের পায়ের কাছে এসে আশ্রয় খুঁজছিল। দূরে কোনো এক একাকী মাঝির বৈঠার শব্দ আর বাতাসের হাহাকার মিলে তৈরি হয়েছিল এক অখণ্ড স্তব্ধতা। সেই ম্লান আলোয় প্রতিমার মুখটা যেন কোনো এক বিষণ্ণ জলরঙের ছবির মতো দেখাচ্ছিল। ও সেদিন মায়াবী হেসে বলেছিল, “এটা একটা অলঙ্ঘনীয় প্রতিজ্ঞা।” গোধূলির সেই রক্তিম আভা ওর কপালে সিঁদুরের মতো লেপ্টে ছিল, যা দেখে সেদিন মনে হয়েছিল, ভরসার কোনো শেষ নেই। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা সেই দিনগুলোতে ডায়েরির পাতায় জমা হয়েছিল এক অদ্ভুত স্বীকারোক্তি— ‘ভিঞ্চি, তুমি এঁকেছো নকল মোনালিসা।’ অথচ তখন একবারও মনে হয়নি, ওই মুগ্ধতার আড়ালে কয়েক বছরেই এক অনিশ্চিত কৃষ্ণপক্ষ নিঃশব্দে ঘনিয়ে আসবে।
৬ মে। সিঁদুরদানের দিন। ওর সিঁথিতে রক্তবর্ণের সেই রেখা টেনে দেওয়ার সময় মনে হয়েছিল, এ যেন এক আমৃত্যু অধিকারের স্বাক্ষর। প্রতিমা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলেছিল, “তোমাকে হারালে আমি অস্তিত্বহীন হয়ে যাব।” মানুষ যখন তীব্র আবেগে কথা বলে, সে ভুলে যায় যে আবেগ কোনো ধ্রুবক নয়, এটি এক অস্থির ও পরিবর্তনশীল চলক মাত্র।
বিভ্রমের এক অদ্ভুত মোহিনী শক্তি আছে। দীর্ঘ ৪ বছরের অভ্যাসে নিজেকে ওর অরণ্যের একমাত্র মহীরুহ ভাবাই ছিল স্বাভাবিক। সেই অম্ল-মধুর দিনগুলোতে চিৎকার-চেঁচামেচি, মান-অভিমান, কিংবা ব্লক করা আর ব্লক তোলার নিয়মিত খেলায় এক পরম নির্ভরতা ছিল। কথা বন্ধ থাকা ধূসর সময়গুলোতেও বুকের ভেতর এক অমোঘ বিশ্বাস কাজ করত—আমার একটা মানুষ আছে, যে শুধুই আমার। অসহ্য রকমের বিশ্বস্ত সেই নারী, যার জীবনের প্রতিটি অলিগলি ছিল আমার নখদর্পণে; এমনকি তার অস্তিত্বের নিভৃততম কোনো ভাবনা বা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছায়াটিও সে আমার কাছে অবারিত করে দিত। সেই স্বচ্ছতার জোরেই মনে হতো, আমাদের মাঝখানে কোনো দেয়াল নেই, বরং এক আদিগন্ত খোলা আকাশ রয়ে গেছে। এই অটল বিশ্বাসের প্রশান্তিতেই আমাদের পার হয়ে গিয়েছিল সহস্র প্রহর।এমনকি মাত্র কিছুদিন আগেই, যখন আমাদের মধ্যে নীরব বিচ্ছিন্নতা—কথাবন্ধের সেই গুমোট দিনগুলোতেও আমি এক অলীক বিশ্বাসে বুক বেঁধেছিলাম। সেই বিমর্ষ প্রহরেও দোকান ঘুরে ঘুরে আসন্ন পূজা উৎসবের জন্য কিনেছিলাম যুগল শাড়ি, পাঞ্জাবি। পরম মমতায় ব্যাগে পুরেছিলাম শেষ হয়ে যাওয়া লাল টিপের পাতার বান্ডিল। ভেবেছিলাম যা কিছু হোক, দিনশেষে আমরা দুজন দুজনার। তখনো জানতাম না, আলমারির ড্রয়ারে যত্ন করে রাখা সেই শাড়ি আর টিপের পাতাগুলো আসলে এক আসন্ন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এক পশলা স্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে।
আমাদের সম্পর্কের শেষ দিনগুলিতে সেই কল্পমানবকে নিয়ে প্রতিমা যখন প্রায়ই বিষণ্ণ গলায় হাহাকার করত—
“সে কথা দিয়েছিল কোনোদিন ছেড়ে যাবে না, কিন্তু কথা রাখেনি। মানুষ কীভাবে এতটা বদলে যায়!”
—তখন এক অদ্ভুত আত্মতুষ্টির সাগরে ভাসতাম আমি। মনে হতো, এই ‘সে’ বুঝি আমি নিজেই; আমারই কোনো অবহেলায় হয়তো ওর এই দহন। নিজেকেই সেই অপরাধী অথচ বিবাগী প্রেমিক ভেবে তখন দার্শনিক উত্তর দিয়েছিলাম
— “পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।”
আমাদের সেই ধ্বংসপ্রায় সম্পর্কের শেষ দিনগুলোতেও আকাশজুড়ে বিভ্রমের এক অদ্ভুত মায়া ছিল। সেই ঘোরলাগা দিনগুলোতে প্রতিমা একদিন ওর নতুন মানুষটিকে নিয়ে খুব দুঃখ ও ভারাক্রান্ত মনে বলল, –
“মানুষটি আমাকে কথা দিয়েছিল কখনো আমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে না।”
কী অমোঘ সেই ভ্রান্তি! ওর চোখের কোণের জল আর দীর্ঘশ্বাসের উৎস যে অন্য কোনো সত্তা, সেই রূঢ় সত্যটুকু বুঝবার মতো শক্তি তখন আমার ছিল না। আমি বোকার মতো ভেবে বসলুম—এ অভিযোগ বুঝি আমারই বিরুদ্ধে। নিজের সর্বস্ব দিয়ে যাকে আগলে রেখেছি, তার সেই অভিমানী হাহাকার শুনে আমি কোনো এক অলীক বীরত্বের নেশায় জবাব দিয়েছিলাম,
“আমি কারো সাথেই কখনো সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করি না। কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রয়োজন হলে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করি শুধু “।
ওর প্রতিটি আকুতি তখন আমার কানে এক অমোঘ প্রাপ্তির মতো বাজত। আমি এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতায় ওর হাহাকারের প্রতিটি শব্দকে নিজের প্রাপ্য ভেবে নিতাম এবং এক ধরনের আত্মঘাতী তৃপ্তির সাগরে ডুব দিতাম। মনে হতো—এই অস্থিরতা বুঝি শুধুই আমাকে ঘিরেই; ওর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস বুঝি আমারই জন্য বরাদ্দ। অথচ কী নিষ্ঠুর নিয়তি! অন্য কারো জন্য সাজানো সেই বিরহ-মঞ্চে আমি তখন নিজের অজান্তেই এক করুণ ভাঁড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কতবার যে এভাবে নিজেকে ‘নায়ক’ ভেবে অকারণে রক্তাক্ত হয়েছি! ওর সেই বিবাগী অপেক্ষা আর ত্যাগের মহিমা—সবই ছিল অন্য কোনো ছায়া-মানুষের জন্য, অথচ আমি সেই নাটকের এক মোহগ্রস্ত দর্শক হয়েই রয়ে গেলাম। এই বিষাক্ত আত্মপ্রতারণার স্মৃতিগুলো আমি চিরতরে ভুলে থাকতে চাই।
আজ এই শূন্যতায় দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে মনে হয়, প্রতিমা হয়তো ঠিকই বলেছিল আমাকে। কোনো কিছু গোপন করার ইচ্ছে থাকলে এসব কথা সে আমাকে না বলেও পারত। নতুন মানুষটির জন্য ওর অনুভূতি, অস্থিরতা, আনুগত্য আর হাহাকার—সবই তো আমাকে সাবলীলভাবেই বলেছে,দিনের পর দিন।আমিই তো অদৃশ্য সত্যের আড়ালে নিজ দায়িত্বেই এক দীর্ঘ অরণ্যের মায়ায় নিজেকে সেই ছায়া-মানব কল্পনা করে রক্তাক্ত হয়েছি। এই যে স্বেচ্ছায় দহনের অনলে ঝাঁপ দেয়া, নিজের চারপাশের সত্যকে অস্বীকার করে এক অলীক নায়কের ছদ্মবেশ ধারণ করা—এই নিদারুণ আত্মঘাতী ভুলের দায় তো প্রতিমার নয়! সে তো তার গন্তব্য বদলেছিল মাত্র, কিন্তু আমি সেই বদলে যাওয়ার মেঘ দেখেও কেন একলা বৃষ্টি নামার অপেক্ষায় প্রহর গুনেছি? আজ এই শূন্যতায় দাঁড়িয়ে নিজের বোকামির দিকে তাকালে কেবল এক চিলতে বিষাক্ত উপহাস ঠোঁটের কোণে বিঁধে থাকে। এ যেন এক নিঃশব্দ হাহাকার, যা চিৎকার করে বলতে চায়—আমি কোনো সম্পর্কের অংশ ছিলাম না, ছিলাম কেবল এক দীর্ঘ বিভ্রমের বালুচর মাত্র। মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো তার সেই অন্ধ বিশ্বাস, যা তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মিথ্যের আয়নায় মুখ দেখতে বাধ্য করে।
এতকাল প্রতিমা তার সেই ছায়া-মানবের কথা যখনই তুলত, আমি এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতায় প্রতিটি বর্ণনাকে নিজের প্রতিচ্ছবি ভেবে নিতাম। ওর প্রতিটি অভিযোগ বা হাহাকারের আড়ালে আমি কেবল নিজেকেই খুঁজে পেতাম। কিন্তু সেদিন যখন ওর ঠোঁট থেকে অনায়াসে বেরিয়ে এল যে, সেই মানুষটি আসলে বাংলাদেশের সীমানায় থাকেন না, তখন এক মুহূর্তের জন্য যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। প্রথমবার আমার চৈতন্য ফিরল যে, আমি আসলে এতোদিন এক দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রমের কারাগারে বন্দী ছিলাম। সংশয় আর সত্যের এক বিষাক্ত মোহনায় দাঁড়িয়ে যখন সরাসরি জানতে চাইলাম কে সেই ছায়া-মানুষ, প্রতিমা তখন লৌকিকতার সবটুকু আবরণ নিমেষেই ছিঁড়ে ফেলল। মুহূর্তেই সে যেন আমার চার বছরের চেনাজানার অতীত এক ধূসর আর দুর্ভেদ্য অরণ্য হয়ে গেল। এক বরফশীতল কণ্ঠে সে এমন এক চরম সত্য ছুড়ে দিল, যা শোনার জন্য আমি বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না—
“তোমাকে বলা যাবে না। তাঁর অনুমতি ছাড়া পরিচয় বললে সেটা তাঁর সাথে ‘চিট’ করা হবে।”
কী এক বীভৎস দহন! আমাদের চার বছরের দীর্ঘ সম্পর্কের শেষপ্রান্তে এসে অস্পষ্টতা দূর করার চেয়েও, প্রতিমার কাছে আজ সেই নতুন ছায়া-মানবের প্রতি নীরব আনুগত্য দেখানোই ছিল পরম দায়বদ্ধতা! আমার আজন্ম লালিত অধিকারের চেয়ে ওই ছায়া-মানবের অনুমতি ওর কাছে আজ অনেক বেশি পবিত্র হয়ে উঠেছে! আশ্চর্য এক নিষ্ঠুর বৈপরীত্য! সেই ছায়া মানুষের সাথে ‘চিট’ না করার যে অজুহাত প্রতিমা দিয়েছে, তার প্রতিটি বর্ণ আসলে আমারই বিশ্বাসের বুক চিরে করা এক চরমতম ‘চিট’। ও যেন তার নবজাত বিশ্বস্ততার বেদিতে আমাদের চার বছরের আত্মত্যাগকে বলি দিয়ে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। আমার অধিকারের চেয়ে ওই নতুন মানবের অনুমতি ওর কাছে আজ অনেক বেশি পবিত্র! চার বছরের একনিষ্ঠ সততার মন্দির ভেঙে ও যেন তার নবজাত বিশ্বস্ততার বেদিতে আমাদের সবটুকু অন্ধ ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতাকে বলি দিয়ে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে।
সে আরও দৃঢ়তার সাথে যোগ করল,
“আমার পরিবারের সবাই জানে যে, আমি কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করি না।”
আমাদের সেই শেষ দিনে প্রতিমা আমাকে আরও বলেছিল,
“যদি কোনোদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে পারি যে, কেন সে এমন করল তবে সেদিন পরিচয় বলবো।”
আমি স্তব্ধ হয়ে ওর সেই অবিচল প্রত্যয় দেখছিলাম। এক নতুন মানুষের প্রতি ওর এই তীব্র আনুগত্য আর দায়বদ্ধতা দেখে আমার বুকের ভেতরটা যেন সহস্র কাঁচের টুকরোয় চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। বিবশ ঠোঁটে আমি শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিলাম, “সেই সুযোগ আমি কখনোই দেব না তোমাকে।”
নতুন মানুষটির সাথে ওর সম্পর্কের কথা আমি কিছুই জানিনা বলে আক্ষেপ করায় প্রতিমা খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাকে বলেছিল—
“তার সাথে এখনো তেমন কোনো সম্পর্ক হয়নি যেটা তোমাকে বলার মতো। তেমন হলে বলব।”
ওর এই কথা শুনে আমি অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলাম! মনে মনে ভাবলাম, চার বছরের সেই অটল বিশ্বাসের মহীরুহ আজ উপড়ে পড়েছে, আমার অধিকারের আকাশটুকু আজ অন্য কারো অনুমতির কাছে বন্দি—এর চেয়েও বেশি আর কী কী হলে সেটা ‘বলার মতো’ যোগ্য হয়ে উঠবে প্রতিমার কাছে? আমাদের চার বছরের প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে ধুলোয় মিশে গেল, সেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিভা আরও কী কী চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করেছিলো, জানিনা। আসলে মায়া যখন কেটে যায়, তখন ধ্বংসস্তূপকেও স্রেফ ধুলিকণা মনে হয়। সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো এটিই—যাকে এতোদিন একান্তই নিজের বলে ভেবেছি, তার কাছেই নিজের নিঃস্ব হওয়ার গল্পটুকু আর বলা হবেনা কোনোদিন ।
নরক যন্ত্রণার স্মৃতিগুলো ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টায় নিজেকে কাজের মধ্যে আরও ব্যস্ত করে তুলেছি এই কদিনে। তবুও নিয়মিত হাসি,খুশি আর উচ্ছলতার এক নিপুণ অভিনয়ের আড়ালে অবিরাম বয়ে চলে অদৃশ্য রক্তগঙ্গা। জানি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই যন্ত্রণা কুকড়ে খাবে আমাকে।
অনেকদিন আগের এক মেঘলা দুপুরে প্রতিমা তার নিজস্ব এক অদ্ভুত দর্শনের কথা শুনিয়েছিল। সে বলেছিল,
“আপন কেউ যদি আমাকে ভুলই বুঝতে পারে, তবে সেই ভুল ভাঙানোর কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করি না।”
আমি সেদিন ওর এই কথার সাথে প্রবল ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। ওর চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, –
” ভুল বোঝার যদি নির্দিষ্ট কোনো কারণ থেকে থাকে এবং সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র আকাঙ্ক্ষাও অবশিষ্ট থাকে, তবে অপরিহার্যভাবেই যেকোনো সংশয় স্পষ্ট করা ভালোবাসার এক পরম দায়। নইলে বুঝতে হবে আগ্রহটাই হারিয়ে গিয়েছে।”
আজ এই নিস্তব্ধ ধূসর সময়ে দাঁড়িয়ে আমি কেবল নিজের সেই অদম্য বিশ্বাসের ওপর আক্ষেপ করতে পারি। ও হয়তো সেদিন ওর দর্শনে অটল ছিল, কিন্তু আমি আমার মনের অজান্তেই ওর প্রতিটি রহস্যময় নীরবতা আর অস্পষ্টতাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছিলাম। কী অদ্ভুত এক মোহে আমি প্রতিটি সংশয়ের কুয়াশাকেই মায়া ভেবে ভুল করেছি! আমি নিজেই নিজেকে এক অলীক নায়কের সিংহাসনে বসিয়ে দীর্ঘ ভ্রমের উৎসব পালন করেছি। আজ এই রক্তক্ষরণের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে—ভালোবাসার যে ‘অপরিহার্য দায়’ মেটানোর কথা আমি বলেছিলাম, প্রতিমা হয়তো কোনোদিন সেই দায়ের ব্যাকরণটাই পড়তে চায়নি।
আমি যাকে অখণ্ড আকাশ ভেবে ধ্রুবতারার খোঁজে পথ চলেছি, সেই আলোকবর্তিকাটিই ছিল আমার জীবনের দীর্ঘতম এক মায়া। দীর্ঘ চার বছর আমি তো সেই প্রেমের তরীই পরম যত্নে বেয়ে চলেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি মাত্র কয়েক দিনের ঝড়ে সবকিছু এভাবে এলোমেলো হয়ে যাবে। নিজেকে ‘নায়ক’ ভেবে যে বীরত্বের স্বপ্ন বুনেছি, আজ বুঝতে পারছি—সেটি ছিল আমারই সাজানো এক নিঃসঙ্গ নাটকের করুণতম শেষ দৃশ্য। এটি কোনো প্রতিশোধ নয়, বরং নিজেরই বিশ্বাসের আঙিনায় সযত্নে লালন করা এক অস্পষ্টতার বিষণ্ণ পরিণতি। নিয়তি হয়তো এভাবেই হাসে—যাকে আমরা শেষ ঠিকানা ভাবি, দিনশেষে দেখা যায় সে ছিল রোদের ভেতরে থাকা এক টুকরো মায়ার ছায়া মাত্র, যা আঁধার নামতেই নিঃশব্দে মিলিয়ে গিয়েছে। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে এই যে আমার মোহভঙ্গ স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা—এটি কোনো পরাজয় নয়; এ যেনো হাতে জমে থাকা এক মুঠো শীতল ছাই।
মানুষের মন যখন কোনো নতুন মেরুতে স্থির হয়, তখন তার কাছে ফেলে আসা পৃথিবীটা যে কতটা তুচ্ছ হয়ে যায়, তা আজ প্রতিমার নির্লিপ্ত চোখ দেখে বুঝতে পারছি। যেখানে অস্তিত্বের সবটুকু নিংড়ে দেওয়া ভালোবাসা আজ মূল্যহীন, সেখানে এক নামহীন আগন্তুকের প্রতি তার আনুগত্যই হয়ে উঠেছে একমাত্র পরম সত্য। কী নিদারুণ পরিহাস! নিজের বুকের রক্ত দিয়ে একদিন যে প্রদীপ জ্বেলেছিলাম, আজ সেই প্রদীপের আলোয় প্রতিমা অন্য কাউকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমি একা দাঁড়িয়ে আছি আমারই নিঃস্ব ছায়ার ওপর। এই রক্তক্ষরণ কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না; এটি এক জীবন্ত মানুষের নিজেরই অস্তিত্বের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গাওয়া করুণতম এক শেষ গান।
আমাদের চার বছরের দীর্ঘ পথচলায় প্রতিমা আমাকে ভালোবেসেছিল ওর অস্তিত্বের সবটুকু সুধা দিয়ে। ওর সেই বাঁধভাঙা ভালোবাসা ছিল আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ কোনো প্রাপ্তি। সেই নিবিড় অনুরাগের সামনে নিজেকে বড় বেশি তুচ্ছ মনে হতো সব সময়। জীবনের প্রতিটি পরতে ছিল ওর মায়াময় উজ্জ্বল উপস্থিতি। আমার সামান্য অসুস্থতায় ওর সেই উৎকণ্ঠিত উপবাস, আমার বিপদমুক্তি আর মঙ্গল কামনায় ওর নিভৃত পূজা—সেই পবিত্র মুহূর্তগুলো ছিল আমার হৃদয়ের পরম সম্পদ। রৌদ্রালোকিত মধ্যাহ্ন থেকে শুরু করে বিষণ্ণ মেঘলা দিন কিংবা নিশীথের ঝোড়ো পরিস্থিতি—সময়ের প্রতিটি প্রহরে ওর সবটুকু মনোযোগ আমাকে এক অলৌকিক পূর্ণতায় ভরিয়ে দিত। আজও এই শূন্যতায় দাঁড়িয়ে মনে হয়—তখন ওর প্রতিটি মান-অভিমান আর চোখের জল ছিল কোনো এক পবিত্র প্রার্থনার মতো সত্যি, যা আমি তখন আমার বিশ্বাসের মন্দিরে বিগ্রহের মতো আগলে রেখেছিলাম।
কিন্তু মানুষের মন বড় বিচিত্র এক গোলকধাঁধা। এখানে আলো আর অন্ধকারের সীমানা এতটাই ধূসর যে, কখন এক পরম বিশ্বস্ততা এক অলীক মোহের চোরাবালিতে তলিয়ে যায়, তার হদিস খোদ সেই মনের মালিকও পায় না। যে হৃদপিণ্ড একদিন আমারই নামে স্পন্দিত হতো, আজ সেখানে অন্য কোনো এক ছায়া-মানবের অদৃশ্য সাম্রাজ্য। মানুষের মন আসলে কোনো ধ্রুবক নয়; এটি এক অস্থির আয়না, যা সময়ের সাথে সাথে নিজের প্রতিচ্ছবি বদলে ফেলে। সেই নিয়মেই হয়তো কোনো এক মায়াবী কুয়াশা বা ‘ঘোর’ ওকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। সেই ঘোরলাগা সময়েও প্রতিমা আমাকে ঠকায়নি, বরং ও নিজেই নিজের ভেতর থেকে হারিয়ে গিয়েছে। প্রবল এক মোহ এসে ওর চিরচেনা সত্তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। যে প্রতিমা আমার জন্য পৃথিবী ছাড়তে পারত, সেই একই প্রতিমা আজ এক নতুন মোহের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। এই বদলে যাওয়াটা কোনো পরিকল্পিত প্রতারণা নয়। এ যেন এক বসন্তের শেষে হুট করে আসা কালবৈশাখী, যা মুহূর্তেই সব সবুজকে ধূসর করে দেয়।
আমি আর সইতে পারছিলাম না। তীব্র ঘৃণা আর অপমানের জ্বালায় ঝলসে যাওয়া গলায় যখন বললাম—
“প্রতিমা, আজ থেকে তোমার জীবনে আমি চিরতরে মুছে গেলাম। যে হাতে একদিন তোমার সিঁথিতে রক্তিম স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলাম, আজ সেই হাতেই সবটুকু মুছে দিয়ে তোমাকে মুক্তি দিলাম। আমার পৃথিবীতে আজ থেকে প্রতিমা নামে আর কেউ নেই।”—
তখনো ওর চোখের পাতায় এক বিন্দু অনুশোচনা ছিলো না। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম আমাদের চার বছরের সবটুকু দায়বদ্ধতার প্রতি ওর সেই নিষ্ঠুরতম নির্বিকার আচরণ। সযত্নে লালিত সেই বিশ্বাসের নীলমণিটি এরপরেই চূড়ান্তভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেল প্রতিমার অমানবিক নির্লিপ্ততায়। চার বছরের পরম নির্ভরতা যেন মুহূর্তেই এক অপরিচিত মরুভূমিতে গিয়ে আছড়ে পড়ল। আমি প্রতিমাকে খুব সিরিয়াসলি বলেছিলাম-
“জীবনে আর কখনো আমার মুখ দেখবে না তুমি, কোনো যোগাযোগও থাকবে না।”
কিন্তু তাতেও তার কোনো উদ্বেগ ছিল না। সেই চরম বিচ্ছেদের মুহূর্তেও সে এক অদ্ভুত অবিচলতায় দাঁড়িয়ে রইল, যেন চার বছরের এই বিচ্ছেদ ওর কাছে স্রেফ একটা তুচ্ছ ঘটনা মাত্র।
বিচ্ছেদের সেই চূড়ান্ত যবনিকা পতনের পর, প্রতিমা আর যোগাযোগ করেনি আমার সাথে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে ওর বিরহী স্ট্যাটাসগুলো চোখে পড়ে—অব্যক্ত যন্ত্রণায় নীল হয়ে থাকা কিছু শব্দগুচ্ছ। কিন্তু সেই হাহাকার ঠিক কোন মানুষটির উদ্দেশ্যে? সেই সত্যটুকু নিশ্চিত করে বুঝতে পারার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছি আরও আগেই। তবে ওর সাম্প্রতিক প্রতিটি পঙক্তি আর বিষণ্ণতার সুর বিগত কয়েকদিনের মতোই সেই নামহীন ছায়া-মানবের বিরহেই বেশি মানানসই। এরই মাঝে দুদিন পার হয়ে গিয়েছে। নিজেকে স্পষ্ট রাখার সেই একতরফা দায়বদ্ধতা থেকেই আমার বুকের ভেতরের সেই দগদগে রক্তক্ষরণ আর অস্থির ভাবনাগুলো, শেষবারের মতো সবিস্তারে লিখে পাঠালাম ওকে। আমি কোনো প্রতিদান আশা করিনি, তবে অবচেতনে হয়তো একবিন্দু মানবিক বোধের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কী নিষ্ঠুর সেই প্রতিদান! যেখানে সহস্র শব্দের দহন ছিল, সেখানে প্রতিমা নির্বিকারভাবে কেবল একবাক্যের এক তুষারশীতল উত্তর দিল—
‘শুধু একটা কথাই বলব, তোমার বোঝায় ভুল রয়েছে’।
আমি কোনো প্রত্যুত্তর দিইনি। কারণ নীরবতাই এখন আমার শ্রেষ্ঠ আত্মরক্ষা। আমি আসলে চিরতরে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দিতে চাই প্রতিমার নিজের জবানিতে উঠে আসা সেইসব দহনকারী সত্যগুলোকে। নিজের চোখে দেখা, আমার প্রতি ওর সেই নির্মম, বরফশীতল আর চরম নির্লিপ্ততার স্মৃতিগুলোকে। জীবন হয়তো এমনই—যাকে আমরা ধ্রুব সত্য ভেবে আঁকড়ে ধরি, দিনশেষে তার অস্পষ্টতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে দাঁড়ায়। এর একদিন পরেই প্রতিমা লিখলো—
‘আমিতো তোমার শত্রু নই। কথা বলতে সমস্যা হওয়ার কথা না।’
বাক্যটি পড়ে আমি দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম। আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই সে আমার শত্রু নয়। কারণ, একজন শত্রুর পক্ষেও কখনো সম্ভব হবেনা, কাউকে এভাবে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দেয়া।
প্রতিমা আমার জীবনে কেবল ভালোবাসার দেবীই ছিল না, ছিল এক আদিগন্ত বিশ্বাসের ভূমি—যাকে ঘিরে আমার সমস্ত পৃথিবী আবর্তিত হতো। অথচ আজ এই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ভালোবাসার সেই আকাশছোঁয়া তীব্রতা মাপতে গিয়ে জীবন থেকে যা হারিয়ে গেছে, তার ক্ষতিপূরণ কোনোদিন মিলবে না আর। অন্ধ বিশ্বাসে ভালোবাসার দহন বুঝি এমনই বিধ্বংসী হয়! বুকের গভীরের এই দগদগে ক্ষত সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে আমাকে। তাই ভুলে যেতে চাই প্রতিমার সকল স্মৃতি। সেই নিবিড় আর চিরচেনা আপন মানুষটিতো মরে গেছে অনেক আগেই। এখন আমার সামনে যে ছায়া দাঁড়িয়ে, সে তো কেবল এক অলীক ঘোরে বদলে যাওয়া সম্পূর্ণ অচেনা এক নারী। আমি একে চিনিনা।
গত কয়েক রাত কেটেছে ঘুমের ওষুধের নিস্তব্ধ অরণ্যে। শারীরিক জটিলতা বেড়েই যাচ্ছে। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস হারানোর আগুনে পুড়ে পুড়ে হৃৎপিণ্ডের যেই টিস্যুগুলো মরে যায়, তার কোনো প্রেসক্রিপশন দিতে পারে না মেডিকেল সায়েন্স। ড্রয়ারে জমে থাকা উৎসবের সেই নতুন শাড়ি আর পাঞ্জাবিগুলো এবং টিপের পাতার সেই বান্ডিলগুলো এখন এক করুণ বোকামির স্মারকচিহ্ন। কী আশ্চর্য, এই হাত দিয়েই তো প্রতিমার কপালে অমরত্বের সিঁদুর পরিয়েছিলাম! আজ সেই হাতটাই কাঁপছে এক গ্লাস জল ধরতে গিয়ে।
আসলে জীবনের কোনো অর্থ নেই। সবাই এখানে একেকজন দহন-যাত্রী। জানালার কাচ ঝাপসা হয়ে আসছে—ঠিক যেমন ঝাপসা হয়ে গেছে চার বছরের বিশ্বাস। পাসপোর্টটা পড়ে আছে বিছানায়—পাশেই কিছু অব্যবহৃত ওষধি পাতা, শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে—ঠিক যেমন করে ভেঙে চুরমার হয়েছে আমাদের চার বছরের আস্থা। যে স্মৃতিগুলো বিষ হয়ে রক্তে মিশে গেছে, কোনো ওষধি পাতাই তার দেয়া ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে না। টেবিলের কোণে পড়ে থাকা ঠান্ডা কফির মগ আর দেয়ালে ঘড়ির একঘেয়ে টিকটিক শব্দ—সবই এখন বিচ্ছেদের কফিনে বিঁধে যাওয়া একেকটি নিঃশব্দ পেরেক। আমি সোফায় হেলান দিয়ে শেষবারের মতো সেই ৬ মে-র ছবিটা মনের আয়নায় আনলাম। বাইরে ঝড় চলছে। বাতাসের উন্মত্ত আর্তনাদ আর জানালার কাচে বৃষ্টির তীব্র করাঘাত যেন এক আদিম হাহাকারের সুর তুলছে। আমি স্তব্ধ হয়ে ভাবলাম—বাইরের এই প্রলয় কি আমার ভেতরের ভাঙচুরের চেয়েও বেশি তীব্র? প্রকৃতি তো ঝড়ের পর শান্ত হয়, ধুলোবালি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়; কিন্তু চার বছরের বিশ্বাস ভাঙার এই যে ঝড় আমার অস্তিত্বকে তছনছ করে দিয়ে গেল, তার কি কোনো শান্ত সকাল আছে? বাইরের আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে আছে, কিন্তু আমার ভেতরের আকাশটা যে অবিশ্বাসের গাঢ় অন্ধকারে চিরতরে ম্লান হয়ে গেছে, সেই খবর বহন করবে
কোন মেঘদূত? বিদ্যুতের ঝিলিক যখন অন্ধকার ঘরটাকে মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে দিচ্ছে, তখন বিছানায় পড়ে থাকা পাসপোর্ট আর ওষধি পাতাগুলোকে মনে হচ্ছে এক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। এই ঝড়ে হয়তো অনেক মহীরুহ আজ উপড়ে পড়বে, ঠিক যেমন প্রতিমার ওই বরফশীতল কণ্ঠের আঘাতে আমার চার বছরের আস্থার মহীরুহটি শিকড়সহ উপড়ে গেছে। বাইরের প্রকৃতি আজ কেবল আমার ভেতরের নরক যন্ত্রণার এক দৃশ্যমান মহড়া দিচ্ছে মাত্র। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা চিরকুটে শুধু শেষ কয়েকটি লাইন অস্পষ্ট অক্ষরে আঁকা রইল:
“প্রতিমা, তুমি ভালো থেকো তোমার নতুন ঘোরের স্বর্গালোকে। আর সময় করে আমাকে একেবারেই ভুলে যেও। আমিও তোমাকে ভুলে থাকতে চাই। আমাদের সবগুলো মুহূর্ত, স্মৃতি, দৈনন্দিন অভ্যাস;সবটুকু ভুলে থাকতে চাই। জীবনে আর কোনোদিন তোমাকে বিশ্বাস করা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে। বিশ্বাসহীনতার এই নিষ্ঠুর দহন আমাকে সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে ”
প্রতিমা হয়তো কোনো এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় পুরনো ডায়েরি খুঁজতে গিয়ে হুট করে থমকে দাঁড়াবে। ঝরোঝরো বৃষ্টির শব্দে যখন চারপাশটা নিঝুম হয়ে আসবে, তখন ধুলো জমা কোনো পাতার ভাঁজে হয়তো মুহূর্তের জন্য মূর্ত হয়ে উঠবে সেই সিঁদুররেখার স্মৃতি। আমাদের সেই সোনালী দিনগুলোর মায়া সেদিন ওকে বড্ড আনমনা করে দেবে। স্মৃতির জানালায় এক নিমেষের জন্য খুঁজে ফিরবে বুড়িগঙ্গার সেই তামাটে জল, গোধূলি বেলার আকাশছোঁয়া ভরসা, আমার দেয়া নিখাদ ভালোবাসা এবং আরও অনেক কিছু।যদিও বর্তমানের এই ঘোরলাগা সময়টায় এইসব দহন ওকে পোড়াতে পারবে না তেমন। কারণ, আমার প্রতিমা এতোদিনে ‘চিট’ না করার এক নির্দয় ব্যাকরণ শিখে নিয়েছে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে থমকে যাওয়া কোনো এক উদাস দুপুরে, যখন চারদিকের কোলাহল থেমে আসবে, তখন ওর অবচেতন মন হয়তো ডুকরে কেঁদে উঠবে সেই হারিয়ে যাওয়া আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু তার অনেক আগেই পুরনো অস্তিত্বে ফিরে আসার সব পথ চিরকালের জন্য মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
মানুষের মৃত্যু আসলে একবার হয় না। প্রথম মৃত্যু হয় বিশ্বাসের, তারপর স্বপ্নের, আর সবশেষে হাড়-মাংসের এই খাঁচাটার। বৈশাখের সেই যুগল শাড়িটার ভাঁজ হয়তো একদিন হয়ে যাবে ফিকে। সময়ের নিয়মে প্রতিমার সেই ‘ঘোরলাগা’ অসাধারণ মানুষটিও হয়তো একদিন অতি সাধারণ এক রক্ত-মাংসের মানবে পরিণত হবে। তার সেই ঘোরলাগা মায়া যখন অসাধারণত্বের সিংহাসন থেকে নেমে আসবে, সেদিন হয়তো প্রতিমার চোখের ওপর থেকে রঙিন কুয়াশার সেই পর্দাটা ছিঁড়ে যাবে। কিন্তু এই যে একটি জীবন অবিশ্বাসের পাথুরে ভার নিয়ে থমকে গেল, তার হিসাব হয়তো কোনো মহাজাগতিক খেরোখাতায় লেখা থাকবে না কখনো।
আসলে আমরা কেউ কাউকে ঠকাই না; আমরা শুধু সময়ের অজুহাতে নিজের ভেতরকার মানুষটাকে বদলে ফেলি। সেই বদলে যাওয়ার মিছিলে কেউ হয় বিজয়ী, আবার কেউ হয়-নিজেরই হৃদপিণ্ডের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এক নিঃসঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক। মানুষের বিশ্বাস মরে গেলে সেটা পাথর হয়ে হৃদপিণ্ডে আটকে থাকে। আমি সেই পাথুরে ভার নিয়েই এক দীর্ঘ ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। এ মৃত্যু নয়, এ এক অনন্ত অমাবস্যার নিস্তব্ধতা।
প্রেম চিরকালই একপাক্ষিক, দ্বিপাক্ষিক কেবল তার অভিনয়টুকু।



Post Comment