Loading Now

যেভাবে আসিম ইবন সাবিত (রা.)-এর পবিত্র দেহ মৌমাছি ও আল্লাহর কুদরতে রক্ষা পেয়েছিল

অনলাইন ডেক্স ।।

ইসলামের ইতিহাস সাহস, ত্যাগ ও ইমানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরপুর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের জীবনচরিত সেই ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়। তাদের কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের জন্য স্মরণীয়, কেউ আবার আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও আন্তরিকতার কারণে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেন। এমনই একজন মহান সাহাবি হলেন হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.), যার মরদেহকে আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে রক্ষা করেছিলেন—দিনে মৌমাছির বাহিনী দ্বারা এবং রাতে ঝড়-বৃষ্টির মাধ্যমে।

 

এই সম্মানিত সাহাবির ঘটনা শুধু বিস্ময়কর নয়; বরং এটি প্রমাণ করে আল্লাহ তার আন্তরিক বান্দাদের কীভাবে রক্ষা করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলমানদের অনেকেই এই মহান ঘটনার সঙ্গে পরিচিত নন।

 

হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.) ছিলেন আনসারদের একজন বীর সাহাবি এবং অসাধারণ দক্ষ তীরন্দাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর যুদ্ধকৌশলের প্রশংসা করে বলেন—

اِرْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا

‘হে ইসমাঈলের বংশধররা! তোমরা তীর নিক্ষেপ করো; তোমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ।’ (বুখারি ২৮৯৯)

অন্য বর্ণনায় তার বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধকৌশলের প্রশংসা উল্লেখ রয়েছে। (ইবনে হিশাম, সীরাতুন নববী)

ওহুদের যুদ্ধে বীরত্ব

ওহুদের যুদ্ধে হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.) অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তিনি শত্রুদের দুই যোদ্ধা—হারিস ও মুসাফি‘ (তালহা পরিবারের সন্তান)—কে তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করেন।

তখন তাদের মা সুলাফা বিনতে সাদ প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেন। তিনি ঘোষণা করেন—আসিম (রা.)-এর মাথার খুলি দিয়ে মদ পান করবেন এবং যে তার মাথা এনে দেবে তাকে একশ উট পুরস্কার দেবেন।

বিরে রাজী ঘটনার সূচনা

হিজরির চতুর্থ বছরে ‘আদল’ ও ‘কারা’ গোত্রের কিছু লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য সাহাবি প্রেরণের অনুরোধ করে। যদিও নবীজি (সা.) এতে প্রতারণার আশঙ্কা করেছিলেন, তবুও তিনি দশজন সাহাবিকে পাঠান।

এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.) এবং মারসাদ ইবন আবি মারসাদ (রা.)।

তারা যখন বিরে রাজী নামক স্থানে পৌঁছান, তখন তারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। শত্রুরা ‘রিল’, ‘জাকওয়ান’ ও ‘লিহইয়ান’ গোত্রকে ডেকে আনে। প্রায় একশত সশস্ত্র যোদ্ধা তাদের ঘিরে ফেলে।

শত্রুরা আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে আসিম (রা.) দৃঢ়ভাবে বলেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي لَا أَقْبَلُ فِي ذِمَّةِ كَافِرٍ

‘হে আল্লাহ! আমি কখনো কোনো কাফিরের নিরাপত্তা গ্রহণ করব না।’ (বুখারি ৪০৮৬)

এরপর তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি তীর নিক্ষেপ করে বহু শত্রুকে হত্যা করেন। তীর শেষ হয়ে গেলে বর্শা দিয়ে যুদ্ধ করেন। বর্শা ভেঙে গেলে তলোয়ার তুলে নেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেন।

শহীদ হওয়ার আগে দোয়া

যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي حَمَيْتُ دِينَكَ أَوَّلَ النَّهَارِ فَاحْمِ لَحْمِي آخِرَهُ

‘হে আল্লাহ! দিনের শুরুতে আমি তোমার দ্বীন রক্ষা করেছি; দিনের শেষে তুমি আমার দেহকে রক্ষা করো।’ (ইবনে হিশাম, সীরাতুন নববী; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

অবশেষে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

মৌমাছির অলৌকিক পাহারা

শত্রুরা তার মাথা কেটে নিয়ে যেতে চাইল, যাতে পুরস্কার লাভ করতে পারে। কিন্তু তখন আল্লাহর বিশেষ সাহায্য নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা মৌমাছি ও বোলতার এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন, যারা তার মরদেহ ঘিরে রাখে। কেউ কাছে আসার চেষ্টা করলেই তারা মুখ ও চোখে হুল ফুটিয়ে দেয়। ফলে শত্রুরা ভয়ে পিছিয়ে যায়।

তারা বলে—

‘ওকে আপাতত ছেড়ে দাও, রাত হলে মৌমাছি চলে যাবে।’ (বুখারি ৪০৮৬)

 

ঝড়-বৃষ্টিতে মরদেহ অদৃশ্য

রাত হলে আল্লাহ তাআলা আবার তার কুদরতের নিদর্শন দেখান। প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা নেমে আসে এবং হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.)-এর পবিত্র মরদেহ ভাসিয়ে নিয়ে যায় এমন এক স্থানে, যা কেউ জানতে পারেনি।

সকালে শত্রুরা অনেক খোঁজ করেও তার মরদেহের কোনো চিহ্ন পায়নি। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাকে অপমান থেকে রক্ষা করেন।’ (বুখারি ৪০৮৬)

শিক্ষা

হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—আল্লাহর পথে আন্তরিকভাবে সংগ্রাম করলে আল্লাহ বান্দাকে কখনো অপমানিত করেন না। জীবদ্দশায় যেমন তিনি দ্বীনের জন্য লড়াই করেছেন, মৃত্যুর পরেও আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।

এ ঘটনা আমাদের ইমানকে দৃঢ় করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয়—যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করে, আল্লাহ তার সম্মান রক্ষা করেন দুনিয়া ও আখিরাতে।

আল্লাহ তাআলা হজরত আসিম ইবন সাবিত (রা.)-এর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

তথ্য সূত্র : যুগান্তর,,,,,,

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED