রক্তরাগে অলঙ্কৃত বর্ণমালা: আমাদের অস্তিত্বের অবিনাশী ইশতেহার
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
📌 শীতের রিক্ততা মুছে যখন শিমুল-পলাশের শাখাগুলো আগুনের আবির মেখে জেগে ওঠে, ঠিক তখনই বাংলার হৃদয়ে বেজে ওঠে এক রক্তিম স্মৃতির বিষণ্ণ অথচ গর্বিত সুর। একুশে ফেব্রুয়ারি—আমাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি নির্জীব তারিখ নয়; এটি বাঙালির অস্তিত্বের সেই আদিম ব্যাকরণ, যা লেখা হয়েছিল ধমনীর উষ্ণ স্রোতে। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক লড়াই হয়েছে মাটির জন্য, ক্ষমতার জন্য; কিন্তু কেবল বাঙালিই বুক পেতেছিল তার কণ্ঠস্বরের জন্য, তার হৃদয়ের নিভৃততম ডাক ‘মা’ কথাটির জন্য। ১৯৫২-র সেই মহাপ্রহর, যখন শাসকচক্রের বুলেটের বিপরীতে আমাদের বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর একেকটি অমর নক্ষত্র হয়ে জ্বলে উঠেছিল—সেই আলোর ঝরনাধারায় আজ আমরা খুঁজে পাই আমাদের আত্মপরিচয়ের পরম দিশা।
ইতিহাস সেদিন থমকে দাঁড়িয়েছিল এক বিষাক্ত ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মুখে। ১৯৪৭ সালের শেষলগ্নে করাচি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার যে চক্রান্তের বীজ বপন করা হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী—বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া। এই প্রশাসনিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের শুরুতেই প্রথম বজ্রকণ্ঠ হয়ে গর্জে ওঠেন কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি যখন সাত কোটি মানুষের প্রাণের দাবি নিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ঐতিহাসিক প্রস্তাব রাখলেন, তখন শাসকেরা তাঁকে দেশদ্রোহিতার তকমা দিয়ে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। তবে প্রতিবাদের চূড়ান্ত বিচ্ছুরণ ঘটে ১৯৪৮ সালের ২৪শে মার্চ কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন দম্ভভরে ঘোষণা করেন যে কেবল উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা, তখন উপস্থিত তরুণ ছাত্ররা মুহুর্তেই সমস্বরে ‘না’ ‘না’ ধ্বনি তুলে সেই দাম্ভিক উক্তি প্রত্যাখ্যান করে। জিন্নাহর চোখের ওপর সেই সাহসী প্রতিবাদই ছিল পরাধীনতার শিকল ভাঙার প্রথম অস্ফুট গর্জন।
১৯৪৮-এর সেই স্ফুলিঙ্গ পরবর্তী চার বছর ধরে এক গভীর পরিক্রমায় বাঙালির হৃদয়ে দাবানল হয়ে বিস্তার লাভ করে। ১১ই মার্চ ‘ভাষা দিবস’ পালন থেকে শুরু করে লিয়াকত আলী খানের ঢাকা আগমন—প্রতিটি ধাপে বাঙালি তার অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। ৪৮ থেকে ৫২-র এই মধ্যবর্তী সময়ে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় এবং কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি থেকেও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিরা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। ১৯৫২ সালের শুরুতে ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ আবারও ঘনীভূত হয় যখন খাজা নাজিমুদ্দীন পুনরায় জিন্নাহর সেই পুরনো দম্ভের পুনরাবৃত্তি করেন। এর প্রতিবাদে ২০শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে সরকার ঢাকা শহরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। সেই রাতেই ছাত্রনেতারা এক ঐতিহাসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন—যেকোনো মূল্যে পরদিন ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে।
২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে এক উত্তাল জনসমুদ্র। ঐতিহাসিক আমতলায় জমায়েত হওয়া হাজার হাজার ছাত্রের লক্ষ্য ছিল একটাই—শৃঙ্খল ভেঙে মিছিল নিয়ে তৎকালীন আইনসভা বা পরিষদ ভবনের দিকে যাওয়া এবং সেখানে উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে বাংলার প্রাণের দাবি সরাসরি তুলে ধরা। ছাত্ররা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ‘১০ জন’ করে মিছিল বের করার অভিনব কৌশল নেয়। দুপুর ৩টা ১০ মিনিটে মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেট পেরিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে এগোতে চাইল, তখন কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশের তপ্ত সিসা বিদীর্ণ করল ছাত্রদের বুক। লুটিয়ে পড়লেন রফিক উদ্দিন, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার ও আব্দুস সালাম। মেডিকেল হোস্টেলের প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই ভিজে গেল অমর শহীদের উষ্ণ রক্তে।
পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশ এক অগ্নিগর্ভ জনপদে পরিণত হয়। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে সুদূর মফস্বল পর্যন্ত প্রতিটি কোণ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। হাইকোর্ট ভবন ও কার্জন হলের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের পুনরায় গুলিবর্ষণে শহীদ হন শফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল এবং কিশোর অহিউল্লাহ। এই শোকাতুর আবহে তরুণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর কলমে জন্ম নেয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি। ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে ঢাকা মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে চিকিৎসক সাঈদ হায়দারের নকশায় নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার। ২৬শে ফেব্রুয়ারি শাসকেরা তা গুঁড়িয়ে দিলেও বাঙালির হৃদয়ের মিনারকে তারা স্পর্শ করতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যালট বিপ্লব এবং অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলার রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি বাঙালির প্রথম বিজয় নিশ্চিত করে।
১৯৫৬-র এই সাংবিধানিক বিজয়ের পথ ধরেই ১৯৫৭ সালে শিল্পী হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থাপত্য নকশা সম্পন্ন করেন। এই আত্মপরিচয়ের ভিত্তি থেকেই ধাপে ধাপে উৎসারিত হয় ১৯৬৬-র ঐতিহাসিক ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং পরিশেষে ১৯৭১-এর মহান মুক্তি সংগ্রাম। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে একুশ আজ কেবল আমাদের নয়, বরং সারা বিশ্বের প্রতিটি মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক ইশতেহার। তবে এই ত্যাগের বিপরীতে আজও উচ্চ আদালতসহ রাষ্ট্রের সকল স্তরে বাংলার পূর্ণ প্রচলন নিশ্চিত না হওয়া এক গভীর পরিহাস। উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বাংলার জয়গান গাওয়ার মাধ্যমেই একুশের প্রকৃত সম্মান রক্ষিত হবে। একুশ আমাদের মেরুদণ্ডকে সোজা করে বাঁচতে শেখায়। যতদিন পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ঢেউ বইবে, ততদিন এই দেশের মানুষ তার প্রাণের গহিন থেকে ‘মা’ বলে ডাকবে, ততদিন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের হৃদয়ে ধ্রুবতারার মতো জ্বলবে।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)



Post Comment