রহস্যে ঘেরা ‘লা পাস্কুয়ালিতা’: জীবন্ত বিয়ের কনে নাকি মোমের পুতুল
অনলাইন ডেক্স ।।
মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলের শহর চিহুয়াহুয়া। সেখানে একটি পুরোনো বিয়ের পোশাকের দোকান আছে নাম লা পপুলার। এই দোকানের শোকেসে বছরের পর বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিয়ের কনের ম্যানিকুইন, যার মুখে রয়েছে অবিশ্বাস্য বাস্তবতার ছাপ। প্রথম দেখায় মনে হয় সে যেন জীবন্ত মানুষ, শুধু সময়ের সঙ্গে জমে যাওয়া স্থিরতা তাকে নিস্তব্ধ করে রেখেছে। এই ম্যানিকুইনটির নাম লা পাস্কুয়ালিতা। বহু দশক ধরে তাকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গল্প ও কিংবদন্তি, যা আজও রহস্যের জাল ছিন্ন করতে দেয় না কোনো দর্শনার্থীকে।
লা পাস্কুয়ালিতাকে প্রথম দোকানের শোকেসে রাখা হয় ১৯৩০ সালে। দোকানের মালিক নতুন বিয়ের পোশাক প্রদর্শনের জন্য এই ম্যানিকুইন এনে রাখেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয় মানুষ খেয়াল করেন এটি আর দশটা সাধারণ ম্যানিকুইনের মতো একেবারেই নয়। তার মুখাবয়ব ছিল অস্বাভাবিকভাবে বাস্তব, চোখে ছিল মানুষের মতো গভীরতা, হাতে দেখা যেত শিরা আর নখের আশপাশের সূক্ষ্ম ভাঁজ। ফলে গুঞ্জন শুরু হলো এ কি সত্যিই কেবল একটি পুতুল? নাকি এটি দোকানের মালিকের মেয়ে পাস্কুয়ালা এসপ্যারজা, যিনি নাকি নিজের বিয়ের আগের দিন বিষাক্ত মাকড়সার কামড়ে মারা যান?
কিংবদন্তি অনুসারে মেয়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা থেকে তার মা নাকি মৃতদেহ মমি করিয়ে ম্যানিকুইনে রূপ দেন এবং সেই বিয়ের পোশাকেই শোকেসে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এই গল্পের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ নেই, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ধীরে ধীরে এটিকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
লা পাস্কুয়ালিতার রহস্যময়তা তার চেহারাতেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। তার আঙুলের গাঁট, নখের স্বাভাবিকতা, মুখের কোমলতা সব মিলিয়ে মনে হয়, সে যেন কোনো একসময় শ্বাস নিত, কথা বলত। দোকানের কর্মীরা জানান, তার পোশাক পরিবর্তন করা হয় খুব সীমিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে এবং দোকান বন্ধ থাকার সময়েই এই কাজ সম্পন্ন হয়। তারা অনেকেই স্বীকার করেন, এত বাস্তবসম্মত একটি ম্যানিকুইন কাছে থেকে দেখা সত্যিই অস্বস্তিকর। তবে দোকান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় এটি কেবল একটি অত্যন্ত দক্ষ শিল্পীর তৈরি ম্যানিকুইন, এর সঙ্গে কোনো মানবদেহের সম্পর্ক নেই।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। লা পাস্কুয়ালিতাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো তার চোখের দৃষ্টি। অনেক দর্শনার্থী দাবি করেন, তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখনো চোখ যেন সামান্য নড়ে যায়। কেউ বলেন, তিনি মাঝেমধ্যে মৃদু হাসেন। যদিও এসব অভিজ্ঞতা মানসিক বিভ্রমের ফলও হতে পারে, তবু এই গল্পগুলো তার রহস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে লা পাস্কুয়ালিতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানান লোককাহিনি অনেকে বিশ্বাস করেন, রাত হলে তিনি নাকি জীবন্ত হয়ে হাঁটেন, আবার কেউ কেউ তাকে সৌভাগ্যের প্রতীকও মনে করেন।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখলে ধারণা করা যায়, লা পাস্কুয়ালিতা আসলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি একটি ওয়াক্স বা সিনথেটিক ম্যানিকুইন। হাতে তৈরি হওয়ায় তার প্রতিটি অংশ এত সূক্ষ্মভাবে গড়া সম্ভব হয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নরম বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু কেন এই সাধারণ ম্যানিকুইনকে ঘিরে এত রহস্য? তার উত্তর পাওয়া যায় মানুষের মনস্তত্ত্বে রহস্য, ভৌতিক গল্প এবং অজানার প্রতি মানুষের আকর্ষণ তাকে কিংবদন্তিতে রূপ দিয়েছে।
আজ লা পাস্কুয়ালিতা শুধু একটি দোকানের প্রদর্শনী পুতুল নয়, বরং চিহুয়াহুয়ার সাংস্কৃতিক প্রতীক। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক তাকে দেখতে দোকানে আসেন। ইউটিউব, ব্লগ, ডকুমেন্টারি সব জায়গায় তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। কেউ তাকে দুঃখময় প্রেমকাহিনির নীরব সাক্ষী মনে করেন, কেউ বা ভৌতিক উপস্থিতি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত দোকান কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে দেয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, তিনি কি সত্যিই সংরক্ষিত মানবদেহ, নাকি নিখুঁত শিল্পকর্ম? রহস্যের জাল এখানেই অটুট থাকে।
বর্তমান সময়েও লা পাস্কুয়ালিতা সেই একইভাবে শোকেসে দাঁড়িয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে তার পোশাক পাল্টানো হয়, নতুন বধূ সাজে তাকে আবার দেখা যায়। শহরের মানুষ তাকে কেবল একটি ম্যানিকুইন হিসেবে দেখে না, বরং দীর্ঘদিনের স্মৃতি, লোককথা ও অনুভূতির প্রতীক হিসেবেই গ্রহণ করেছে।
একদিকে বিজ্ঞানের যুক্তি, অন্যদিকে মানুষের বিশ্বাস এই দুইয়ের দ্বন্দ্বই লা পাস্কুয়ালিতাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। হয়তো সত্য কখনোই জানা যাবে না, কিন্তু এই না-জানাটাই তাকে ঘিরে রহস্যের আবরণ আরও ঘন করে। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে তার সৌন্দর্য সে হয়তো কেবল একটি পুতুল, কিন্তু মানুষের আবেগে সে হয়ে উঠেছে এক কিংবদন্তি বিয়ের কনে, যার গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ছে নীরবে, ঠিক যেমন সে দাঁড়িয়ে থাকে দোকানের কাঁচঘেরা জানালার ভেতর নির্বাক, স্থির, অথচ জীবন্ত মনে হয়।
তথ্য সূত্র : জাগো নিউজ,,,,,



Post Comment