Loading Now

শাশ্বত নৈতিকতার অমর আখ্যান: কাজী কাদের নেওয়াজ ও আমাদের মূল্যবোধের সংকট

📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ

📌 সময়ের প্রবহমান স্রোতে কিছু মানুষ আবির্ভূত হন কেবল ক্ষণস্থায়ী নক্ষত্র হয়ে নয়, বরং অন্ধকারের নিরেট প্রাচীরে আলোর এক চিরন্তন ইশতেহার হয়ে। কাজী কাদের নেওয়াজ ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাধর মানুষ, যাঁর জীবন ও লেখনী এক সমান্তরাল রেখায় মিলেমিশে তৈরি করেছিল অনন্য মানবিক দর্শন। ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে যখন তাঁর জন্ম হয়, তখন কেউ ভাবেনি—ঐতিহ্যের সেই আভিজাত্য একদিন বাংলার সাহিত্যাকাশে নৈতিকতার ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবে। ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি যখন শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তখনই তাঁর ললাটে এক আদর্শ শিক্ষাব্রতীর তিলক অঙ্কিত হয়েছিল।

​কাদের নেওয়াজের জীবনদর্শন ছিল একটি ফলবান বৃক্ষের মতো—যার শিকড় ঐতিহ্যের অনেক গভীরে প্রোথিত, অথচ শাখা-প্রশাখা দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের দিকে প্রসারিত। বর্তমানের যান্ত্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে, যেখানে মানবিক আবেগ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, সেখানে তাঁর দর্শন এক অনন্য রক্ষাকবচ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জন বা বৈষয়িক সাফল্যের সিঁড়ি নয়, বরং এটি মানুষের ‘অহং’ বা দম্ভ বিসর্জনের এক পবিত্র সাধনা। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কেবল পাঠ্যবইয়ের কোনো সাধারণ পঙ্‌ক্তি নয়; এটি ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে জ্ঞানের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক বৈশ্বিক ঘোষণা। দিল্লির সম্রাট আলমগীর যখন তাঁর সন্তানের শিক্ষককে সর্বোচ্চ সম্মান দেন, তখন কবির কলমে রাজশক্তি নতজানু হয় বিবেকের কাছে। তিনি উচ্চস্বরে গেয়ে ওঠেন—
​”উচ্ছ্বাসভরে শিক্ষক আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে / কুর্নিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে— / ‘আজ হতে মোর মাথা উন্নত হলো না কহিতে লবে / সত্যিই আজ বাদশা আলমগীর বড় এক কাজ করেছেন ভবে’।” ( ‘শিক্ষকের মর্যাদা’, কবিতা)

​কাদের নেওয়াজের সৃষ্টিসম্ভার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শব্দকে কেবল ছন্দের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেননি, বরং তাকে দিয়েছেন এক প্রাণবন্ত রূপ। তাঁর ‘মরাল’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ, যেখানে হৃদয়ের আকুতি আর প্রকৃতির নির্জনতা একাকার হয়ে গিয়েছে। ‘নীল কুমুদী’-তে তিনি যে উপমা আর চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন, তা পাঠককে এক পরাবাস্তব শান্ত সমাহিত জগতে নিয়ে যায়। তাঁর কিশোর সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘দাদুর বৈঠক’ কিংবা ‘খানদানী কিচ্ছা’ কেবল নিছক গল্প নয়; এগুলো ছিল ঐতিহ্যের শেকড়ের সাথে নতুন প্রজন্মের সেতুবন্ধন। তাঁর প্রতিটি লেখায় এক ধরণের আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য ফুটে উঠত, যা তাঁকে সমসাময়িক অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। গ্রামীণ জীবনের সারল্য আর আধুনিক মননশীলতার এক আশ্চর্য মিলন ঘটেছে তাঁর প্রতিটি চরণে।

তাঁর শৈশববন্দনাগুলো আজ প্রযুক্তির করাল গ্রাসে বিপন্ন শৈশবকে ফিরে পাওয়ারই করুণ আর্তি।
তিনি যখন লেখেন—
​”মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই / ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।” (সূত্র: ‘মা’, কবিতা; গ্রন্থ: ‘নীল কুমুদী’)

​তখন তা কেবল নিছক কবিতা থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ের এক চিরন্তন মানবিক আকুতি। বর্তমানের যান্ত্রিক একাকীত্বের যুগে এই পঙ্‌ক্তিটি আমাদের অস্তিত্বের সেই মূল কেন্দ্রের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে শর্তহীন ভালোবাসা আর পরম নির্ভরতা ছিল মানুষের একমাত্র আশ্রয়। কবির এই প্রকাশভঙ্গি অত্যন্ত গভীর ও সারল্যমণ্ডিত; তিনি ভাষার জটিল অলঙ্কার ব্যবহার না করেই সরাসরি হৃদয়ের সত্যকে স্পর্শ করেছেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, জগতের সমস্ত বৈষয়িক উন্নতি ও বাহ্যিক চাকচিক্য শেষ পর্যন্ত ‘মা’ নামের এই ক্ষুদ্র অথচ মহাজাগতিক শব্দের কাছে অতি তুচ্ছ। এটি এমন এক চিরন্তন সত্য, যা সময় ও সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে এক বিশ্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করে।

​আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর এই আদর্শকে প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এ বর্ণিত দর্শন কিংবা ইমানুয়েল কান্টের অটল কর্তব্যবোধের সাথে তুলনা করা যায়। আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত ‘স্কিল-বেসড’ শিক্ষার বিপরীতে কাদের নেওয়াজ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে—শিক্ষার চূড়ান্ত গন্তব্য হলো মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগ্রত করা। তিনি সম্রাটের কণ্ঠ দিয়ে বলিয়ে নেন সেই মহাসত্য—
​”বাদশাহ্ কহেন— ‘হেদায়েত! মোর এই দুনিয়াটা তুচ্ছ মনে হয় / আমার সন্তানে আপনি দেননি তো প্রকৃত শিক্ষা যা পাওয়ার যোগ্য নয়।'” (‘শিক্ষকের মর্যাদা’, কবিতা)

​১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার লড়াইয়ের প্রতিটি মোড়ে তাঁর কলম ছিল এক মৌন কিন্তু প্রখর হাতিয়ার। তাঁর সংগ্রাম ছিল মূলত মননশীলতার বন্ধ্যাত্বের বিরুদ্ধে। মাগুরা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলন করেছিলেন, তাঁর সেই আদর্শেই তৈরি হয়েছে এক সমৃদ্ধ প্রজন্ম। তিনি জসীমউদ্দীনের পল্লী-আবেগকে রবীন্দ্রনাথের আভিজাত্যের সাথে মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন তাত্ত্বিক উচ্চতা দিয়েছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় যখন টি. এস. এলিয়ট কিংবা ইয়েটস আধুনিকতার জটিল যন্ত্রণায় ভুগছিলেন, কাদের নেওয়াজ তখন অত্যন্ত স্নিগ্ধভাবে মানুষের মৌলিক মূল্যবোধের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর এই প্রশান্তি তাঁকে বৈশ্বিক ধ্রুপদী লেখকদের কাতারে আসীন করে।

​১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর দর্শন আজ বিশ্বব্যাপী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আজকের পৃথিবীতে যখন স্বার্থপরতার মরুভূমি প্রসারিত হচ্ছে, তখন তাঁর নীতিবোধের পঙ্‌ক্তিমালা আমাদের তৃষ্ণার্ত আত্মাকে শীতল করে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন প্রকৃত বীরত্ব ও আত্মজয়ের পথ—
​”নিজেরে জয় করাই বড় কাজ / পরের জয় কেবল লোক দেখানো সাজ।” (‘আত্মজয়’, কবিতা; গ্রন্থ: ‘মরাল’)

​কাজী কাদের নেওয়াজ কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডের ধূলিকণা নন, তিনি এক চিরন্তন অনুভবের নাম। তাঁর জীবন ও সাহিত্য এক দীর্ঘস্থায়ী গোধূলির মতো—যেখানে অন্ধকার নেই, আছে কেবল এক পবিত্র আলোর আভা। যখন পৃথিবীর সমস্ত যান্ত্রিক কোলাহল থেমে যায় এবং মানুষ নিজের একান্ত সত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকে খোঁজে, তখন তাঁর পঙ্‌ক্তিগুলো হয়ে ওঠে এক নিভৃত প্রার্থনা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন যে, বিনয়ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার এবং কৃতজ্ঞতাই আত্মার একমাত্র পরিচয়। কালের মহাপ্রবাহে অনেক মহীরুহু মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও, কাজী কাদের নেওয়াজ তাঁর সেই স্নিগ্ধ চারিত্রিক ঋজুতা আর নৈতিকতার অমল আলোয় আমাদের জাতীয় মননে চিরকাল প্রদীপ্ত থাকবেন। তিনি এমন এক নাবিক, যিনি শব্দ আর শাশ্বত সত্যের তরণী বেয়ে আমাদের পৌঁছে দেন এক শান্ত সমাহিত মানবিকতার অবিনশ্বর উপকূলে।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED