Loading Now

২০২৫ সালে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ালেন পাঁচ ইরানি নারী বিজ্ঞানী

অনলাইন ডেক্স ।।

২০২৫ সাল ইরানের নারী বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল দৃশ্যপট বদলে দেওয়ার বছর। কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, গবেষণার সীমিত সুযোগ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরানের নারীরা বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে এমন সাফল্য দেখিয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

ক্যান্সার গবেষণা থেকে হৃদযন্ত্র পুনর্গঠন, ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে ভেষজ ওষুধের আধুনিক ব্যবহার— সবখানেই এই নারীরা দেখিয়েছেন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিজ্ঞান থেমে থাকে না। তাদের গবেষণা শুধু গবেষণাগারে আটকে নেই; বাস্তব চিকিৎসা, রোগীর জীবনমান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

২০২৫ সালে তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করেছে যে, ইরানি নারী বিজ্ঞানীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। তারা বৈশ্বিক বিজ্ঞানচর্চার অংশ এবং অনেক ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। এই নিবন্ধে এমন পাঁচজন ইরানি নারী বিজ্ঞানীর গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যাদের কাজ ও স্বীকৃতি ২০২৫ সালকে বিশেষ করে তুলেছে।

ড. সেপিদেহ মির্জায়ী-ভারজেগানি: ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন দিগন্ত

ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘ওষুধ প্রতিরোধ’। রোগীরা প্রথমে চিকিৎসায় সাড়া দিলেও কিছুদিন পর টিউমার নতুন কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে চিকিৎসা ব্যর্থ হয়ে যায়। এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন ইরানি তরুণ বিজ্ঞানী ড. সেপিদেহ মির্জায়ী-ভারজেগানি।

তিনি আণবিক জীববিজ্ঞানের জটিল সংকেতপথ এবং নন-কোডিং আরএনএ নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, ক্যান্সার কোষকে আবারও ওষুধের প্রতি সংবেদনশীল করা সম্ভব। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন মুসলিম বিশ্বের নোবেলখ্যাত ‘মুস্তাফা (সা.) পুরস্কার’।

ড. মির্জায়ী-ভারজেগানি বর্তমানে তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গবেষণা শাখায় কোষ ও উন্নয়নমূলক জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর গবেষণা কেন্দ্রীভূত এনএফ-কেএপি বি (NF-κB) নামের একটি শক্তিশালী নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টরের ওপর, যা শরীরের ৪০০টিরও বেশি জিন নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ভারসাম্যপূর্ণ থাকলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। কিন্তু অতিসক্রিয় হলে এটি ক্যান্সার বৃদ্ধিতে জ্বালানি জোগায়, টিউমার ছড়িয়ে দেয় এবং ওষুধ প্রতিরোধ সৃষ্টি করে।

নতুনত্ব এসেছে এই পথকে ‘নন-কোডিং আরএনএ’-র সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে। দীর্ঘদিন এগুলোকে ‘অপ্রয়োজনীয় জিন’ মনে করা হলেও, এখন প্রমাণ হয়েছে যে এই আরএনএ, বিশেষ করে মাইক্রোআরএনএ (miRNA), মূল সুইচের মতো কাজ করে। কিছু miRNA NF-κB বন্ধ করে ক্যান্সার কোষকে চিকিৎসার প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে, আবার কিছু এটিকে সক্রিয় করে প্রতিরোধ বাড়ায়।

মির্জায়ী গবেষণায় আরও যুক্ত করেছেন ‘লং নন-কোডিং আরএনএ (lncRNA)’ ও  ‘সার্কুলার আরএনএ (circRNA)’, যেগুলো miRNA-এর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এক জটিল আণবিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এগুলো একত্রে NF-κB-এর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা নির্ধারণ করে টিউমার সংকুচিত হবে নাকি ছড়িয়ে পড়বে।

 

 

তার গবেষণা প্রমাণ করেছে, অনেক বিদ্যমান ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ আরও কার্যকর হতে পারে যদি আরএনএ-ভিত্তিক থেরাপির সঙ্গে প্রয়োগ করা যায়। যেমন NF-κB দমনকারী miRNA বৃদ্ধির মাধ্যমে ওষুধ প্রতিরোধ ভেঙে রোগীর আয়ুষ্কাল বাড়ানো সম্ভব।

এই গবেষণা ভবিষ্যতে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন পথ দেখাতে পারে। প্রচলিত ওষুধের সঙ্গে আরএনএভিত্তিক থেরাপি যুক্ত হলে ওষুধ প্রতিরোধ কমে যেতে পারে এবং চিকিৎসা হতে পারে আরও কার্যকর ও রোগীভিত্তিক।

ড. সারা পাহলোয়ান: স্পন্দনশীল হৃদয় পুনরায় নির্মাণ

মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গগুলোর একটি হলো হৃদযন্ত্র। সেটিকে ল্যাবে তৈরি করা চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন লক্ষ্যেই কাজ করছেন ড. সারা পাহলোয়ান।

কার্ডিয়াক কোষ ইলেক্ট্রোফিজিওলজির বিশেষজ্ঞ ড. পাহলোয়ান ইরানের স্টেম সেল গবেষণার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্র রয়ান ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক এবং কার্ডিওভাসকুলার গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে গবেষক দল একটি ইঁদুরের হৃদযন্ত্র থেকে সব কোষ সরিয়ে শুধু প্রাকৃতিক কাঠামো রেখে দেয়। এরপর সেখানে প্রায় ছয় কোটি মানব স্টেম সেল ধাপে ধাপে প্রবেশ করানো হয়। বিশেষ পরিবেশ ও বৃদ্ধিকারী উপাদানের সাহায্যে এসব কোষ হৃদযন্ত্রের কোষে রূপ নেয়।

মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই সেই কৃত্রিম হৃদটিস্যু একসঙ্গে স্পন্দিত হতে শুরু করে। বায়োমেটেরিয়ালস (Biomaterials) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা হৃদযন্ত্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কাজ ভবিষ্যতে হৃদরোগীদের জন্য কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বা হৃদটিস্যু প্রতিস্থাপনের পথ আরও বাস্তব করে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন দাতা অঙ্গের সংকট বিশ্বজুড়েই বড় সমস্যা।

ড. বিবি ফাতেমা হাকির-সাদাত: ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে ক্যান্সারের ওষুধ

ন্যানোবায়োটেক ও ন্যানোমেডিসিনে ড. বিবি ফাতেমা হাকির-সাদাত একটি পরিচিত নাম। এক দশকের বেশি সময় ধরে তার গবেষণা ও উদ্ভাবন ইরানের বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফ্যাকাল্টি অফ নিউ সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজিস’ থেকে ন্যানোবায়োটেকনোলজিতে পিএইচডি অর্জন করেন এবং পরে আমস্টারডামের ভিইউ মেডিকেল সেন্টার (ভিইউএমসি) থেকে ন্যানোমেডিসিনে পিএইচডি অর্জন করেন। ভিইউএমসিতে তার ডক্টরাল গবেষণাপত্রটি ইউরোপের সেরা গবেষণাপত্রগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ইউরোপীয় ডক্টরাল গবেষণা সাধারণত তিন থেকে চারটি আইএসআই-সূচিকৃত প্রকাশনা তৈরি করে, কিন্তু হাকির-সাদাত পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সেখান থেকে প্রকাশিত হয় তার দশটি আন্তর্জাতিক মানের প্রবন্ধ। এই গবেষণার ফলেই একটি নতুন ক্যান্সার ওষুধ উদ্ভাবনের পথ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে উৎপাদনের শেষ ধাপে রয়েছে।

ড. হাকির-সাদাতের নামে রয়েছে ১২টি দেশিয় পেটেন্ট। ভেষজ উদ্ভিদ ও আধুনিক ওষুধ উপাদান ব্যবহার করে তৈরি তাঁর ন্যানোভিত্তিক ফর্মুলেশন ইতোমধ্যে জ্ঞানভিত্তিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

গবেষণা, পেটেন্ট ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, ল্যাবরেটরির গবেষণা কীভাবে বাস্তব চিকিৎসা পণ্যে রূপ নিতে পারে।

তিনি ন্যানোটেকনোলজি এবং ঔষধি গাছ গবেষণায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীয় জার্নালের রিভিউয়ার হিসেবে কাজ করেছেন এবং ৭০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছেন।

ড. মারিয়া বেইহাগি: স্নায়ুরোগে ন্যানো-ভেষজ থেরাপির আশা

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা কমস্টেক (COMSTECH)-এর ইয়াং উইমেন রিসার্চার গ্র্যান্ট লাভ করেন ইরানের নারী গবেষক ড. মারিয়া বেইহাগি। তিনি মাশহাদের একটি স্বাস্থ্যভিত্তিক জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী।

কমস্টেক গবেষণা গ্রান্ট ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (ওআইসি) দেশগুলোর বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাবিষয়ক স্থায়ী কমিটি (কমস্টেক)-এর উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এর লক্ষ্য হলো তরুণ নারী গবেষকদের সহায়তা করা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা জোরদার করা।

ড. মারিয়া বেইহাকির গবেষণার মূল লক্ষ্য অ্যালঝাইমার ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগ। তিনি প্রাকৃতিক উপাদানকে ন্যানো-কণায় রূপান্তর করে এমন একটি খাদ্যসম্পূরক তৈরি করেছেন, যা শরীরে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম।

৩০ জন অ্যালঝাইমার রোগীর ওপর পরীক্ষায় আচরণগত উন্নতি, ঘুমের সমস্যা কমা ও উদ্বেগ হ্রাসের লক্ষণ পাওয়া গেছে। পারকিনসন রোগীদের ক্ষেত্রেও হাত কাঁপা ও উদ্বেগ কমার প্রমাণ মিলেছে।

এই থেরাপি মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে এর সম্ভাবনা বিজ্ঞানীদের আশাবাদী করে তুলছে।

নিজের গবেষণাগত অর্জন সম্পর্কে ড. বেইহাগি বলেন, তারা ন্যানোপ্রযুক্তিভিত্তিক কিছু পণ্য তৈরি করেছেন, যা আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য নকশা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব সাপ্লিমেন্ট চুইংগাম ও ক্যান্ডির আকারে বাজারে আনা হয়, পরে বয়স্কদের জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য করতে সিরাপ আকারে উৎপাদন করা হয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই ওষুধটি ‘ফেনকোল’ ও ‘কোয়েরসেটিন’-এর মতো প্রাকৃতিক ন্যানোকণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এসব উপাদান আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন—যেমন এপিপি ও এমএপিটি’র কার্যক্রম কমিয়ে বা দমন করে ক্ষতিকর প্রোটিন যেমন বিটা-অ্যামিলয়েড ও টাউ উৎপাদন প্রতিরোধ করে, যা স্নায়ুকোষ ধ্বংসে ভূমিকা রাখে।

ইরানি এই নারী গবেষক আরও জানান, এই সাপ্লিমেন্টটি আলঝেইমার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি প্রদাহ কমানো, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং কিছু ক্যানসার প্রতিরোধেও কার্যকর।

ড. রোজা রাহিমি: প্রথাগত চিকিৎসায় বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি

তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের ট্র্যাডিশনাল ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক ড. রোজা রাহিমি ২০২৫ সালের ‘বায়োনরিকা ফাইটোনিয়ারিং অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এই পুরস্কার ভেষজ ওষুধের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও ক্লিনিক্যাল ব্যবহারে অসাধারণ গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয়।

ড. রাহিমি ফার্মডি এবং ট্র্যাডিশনাল ফার্মাসিতে পিএইচডি ধারণ করেন এবং ইরানি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধি গাছের ফার্মাকোলজিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।

২০০টির বেশি গবেষণাপত্রের লেখক ড. রাহিমি একাধিকবার বিশ্বের শীর্ষ এক শতাংশ সর্বাধিক উদ্ধৃত বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। রাহিমির কাজ ইরানি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে থেরাপিউটিক উদ্ভাবনের বিশ্বাসযোগ্য উৎস হিসেবে স্থান দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার কাজ প্রমাণ করেছে, প্রথাগত চিকিৎসা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সমন্বয় করেই এগোতে পারে।

সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এক সম্মিলিত অর্জন

এই পাঁচ নারীর গল্প আলাদা হলেও বার্তাটি একটাই—ইরানি নারী বিজ্ঞানীরা আজ বৈশ্বিক বিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৫ সালে তাদের কাজ গবেষণা, চিকিৎসা ও উদ্ভাবনের সীমা ছাড়িয়েছে। তারা দেখিয়েছেন, অধ্যবসায়, জ্ঞান ও সততা থাকলে সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এই নারীরা শুধু বিজ্ঞানী নন—তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা, ইরানের ভেতরে এবং তার সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে।

তথ্য সূত্র : যুগান্তর,,,,

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED