কঙ্ক্রিটের হৃদয়ে প্রাণের আকুতি: একটি বৃক্ষ-বন্দনা
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
সভ্যতা ও স্থাপত্যের ইতিহাসে মানুষ বরাবরই নিজেকে অধিপতি হিসেবে কল্পনা করেছে। নিজের একচিলতে আবাসের জন্য সে অকাতরে বলি দিয়েছে বনের সবুজ, অরণ্যের স্তব্ধতা। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফলের জায়েদুল ইসলাম মিলন যেন সেই প্রথাগত ধ্বংসলীলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করলেন। তার গৃহের পাঁজরের ভেতর দিয়ে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছটি কেবল একটি বৃক্ষ নয়, বরং তা মানুষের আদি ও অকৃত্রিম মমত্ববোধের এক জীবন্ত দলিল।
জনাব মিলন যখন তার স্বপ্নের প্রাসাদের নকশা করছিলেন, তখন হয়তো আধুনিক বাস্তুশাস্ত্র তাকে বলেছিল গাছটি কেটে ফেলার কথা। কিন্তু একজন প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমীর কাছে স্থাপত্যের জ্যামিতির চেয়ে প্রাণের স্পন্দন অনেক বেশি মূল্যবান। তাই তিনি কুঠার ধরেননি, বরং দেয়াল ও ছাদের কঠিন কাঠামোকে কিছুটা নমনীয় করে জায়গা করে দিয়েছেন এক প্রাচীন সহযাত্রীকে।
এই গৃহ নির্মাণের নেপথ্যে যে দর্শনটি কাজ করেছে, তা হলো সহাবস্থানের দর্শন। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, এই পৃথিবী কেবল মানুষের নয়; এখানে প্রতিটি তৃণাঙ্কুর আর মহীরুহের সমঅধিকার বিদ্যমান। মিলন সাহেবের এই গৃহটি যেন ইট-পাথরের এক ক্যানভাস, যেখানে প্রকৃতি নিজেই নিজের তুলি দিয়ে প্রাণের আল্পনা এঁকেছে। দেয়াল ভেদ করে উঠে যাওয়া নারিকেল গাছের কাণ্ডটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি কৃত্রিম আবরণের চেয়ে প্রকৃতির আদিম প্রাণশক্তি অনেক বেশি অদম্য। এটি একটি দার্শনিক বার্তাও বহন করে—উন্নয়ন মানেই বিনাশ নয়, বরং ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এক সুসমন্বিত সন্ধি। তিনি গাছটিকে শেকড়চ্যুত না করে বরং নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছেন, যা আজকের আত্মকেন্দ্রিক সমাজের জন্য এক পরম শিক্ষা।
বাস্তবিক অর্থে, এই স্থাপত্যটি এখন আর কেবল একটি বাসস্থান নেই, এটি হয়ে উঠেছে এক শিল্পকর্ম। যেখানে ছাদের কার্নিশ আর গাছের পাতা একে অপরের সাথে মিতালী করে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আর বন উজাড়ের এই ক্রান্তিকালে যখন আমরা একটু শীতল বাতাসের জন্য হাহাকার করি, তখন জনাব মিলনের এই উদ্যোগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইচ্ছা থাকলে প্রাণের সাথে সন্ধি করে থাকা সম্ভব। এটি কোনো যান্ত্রিক স্থপতির নকশা নয়, বরং এক সংবেদনশীল হৃদয়ের ব্যাকুলতা।
জায়েদুল ইসলাম মিলনের এই বৃক্ষপ্রীতি প্রমাণ করে যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার ধ্বংসে নয়, বরং তার সংরক্ষণের ক্ষমতায়। যতদিন এই ঘরের দেয়ালে নারিকেল পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যাবে, ততদিন এই গৃহটি পৃথিবীর বুকে এক অনন্য ‘অক্সিজেন কারখানা’ এবং মানবিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রকৃতির প্রতি এমন নিবিড় দায়বদ্ধতা যদি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত হতো, তবে পৃথিবী হয়তো আবার তার হারানো সবুজের ঐশ্বর্য ফিরে পেত।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)



Post Comment