Loading Now

পারস্যের দহন ও বদ্বীপের প্রতিচ্ছবি: আধিপত্যবাদের এক শাশ্বত উপাখ্যান

📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ ।।

​📌 ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ও অমীমাংসিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ আবারও পারস্য উপসাগরের তপ্ত হাওয়া বিশ্ব রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে একটি বিশেষ সংখ্যা—”১২ হাজার নিহত”—দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। একটি সুপ্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রে যখন কয়েক দিনের ব্যবধানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির দাবি করা হয়, তখন আমাদের মানবিক বিবেক যেমন তাড়িত হয়, তেমনি তা সংশয়ী হতে বাধ্য করে এর নেপথ্য কুশীলবদের প্রকৃত অভিসন্ধি নিয়ে। এই তথ্যের উৎস হিসেবে যখন নির্দিষ্ট কিছু পশ্চিমা ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নাম অবলীলায় উঠে আসে, তখন দালিলিক প্রমাণের চেয়ে ‘ধারণা তৈরির রাজনীতি’ বা প্রোপাগান্ডাই বেশি মুখ্য হয়ে ওঠে। কারণ, বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ দর্শনে যেমনটি দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে আধিপত্যকামী শক্তি কেবল বন্দুকের নলে শাসন করে না, বরং তারা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনের ভেতর একটি ‘কৃত্রিম সম্মতি’ উৎপাদন করে নেয়। এটি ঠিক তেমনি একটি কৌশল, যা অতীতে চিলির আলেন্দে কিংবা কঙ্গোর লুমুম্বার পতনের আগে বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। যখন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সুপরিকল্পিত চিত্র বারবার বিশ্ববাসীর চোখের সামনে আছড়ে পড়ে, তখন আমাদের অবচেতন মন সেই অতিরঞ্জিত তথ্যকে সত্য বলে মেনে নিতে শুরু করে; আর এভাবেই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হস্তক্ষেপের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করা হয়।

​ইরানের এই সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক আশ্চর্য ও বিষণ্ণ সমান্তরাল রেখা খুঁজে পাওয়া যায়। আজ যেভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি ও জনরোষকে পুঁজি করে পশ্চিমের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের নীল নকশা কাজ করছে, তার প্রতিচ্ছবি আমরা এই বদ্বীপের ইতিহাসের পরতে পরতে দেখেছি। ১৯৫৩ সালের তেহরানের ‘অপারেশন এজাক্স’ আর ১৯৭০-এর দশকের ঢাকা—উভয় ক্ষেত্রেই সমান্তরালভাবে দেখা যায়, যখনই কোনো রাষ্ট্র নিজের সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তখনই তার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অদৃশ্য ও কঠোর হাত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের এই বদ্বীপে কেবল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে খাদ্য-সাহায্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং তারা তাদের সেই আধিপত্যকামী এজেন্ডা আজও ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মবেশে সক্রিয় রেখেছে। কখনো গণতন্ত্রের মেকি বুলি, কখনো মানবাধিকারের প্রেসক্রিপশন, আবার কখনো বা সরাসরি অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তারা আজও দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নিজেদের ছায়া বজায় রাখতে মরিয়া।

​এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ দর্শনে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব প্রাচ্যের দেশগুলোকে সবসময় ‘অস্থিতিশীল’ ও ‘বর্বরোচিত’ হিসেবে চিত্রিত করে। এই হীনম্মন্যতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববাসীকে এই মন্ত্রে দীক্ষিত করা যে, প্রাচ্যের দেশগুলো নিজেরা নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম, তাই সেখানে পশ্চিমাদের ‘ত্রাতা’ হিসেবে হস্তক্ষেপ করা অনিবার্য। ইরানের ওপর আরোপিত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মূলত সেই নব্য-উপনিবেশবাদী দর্শনেরই একটি আধুনিক সংস্করণ। আজ যখন ইরানের রিয়াল তার ঐতিহাসিক অবমূল্যায়নের শিকার এবং সাধারণ মানুষ একবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করে, তখন সেই মানবিক সংকটকে পুঁজি করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ বা একতরফা প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের নানা সরঞ্জাম। কিন্তু দালিলিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই হস্তক্ষেপ কেবল তথ্যের অবাধ প্রবাহ নয়, বরং তা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার এক অত্যাধুনিক ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। বাংলাদেশের সচেতন সমাজ জানে, এই হস্তক্ষেপের ধারা অতীতেও ছিল এবং বর্তমানেও তা ভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের অস্তিত্বের মূলে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​১২ হাজার নিহতের যে সংখ্যাটি বর্তমানে প্রচার করা হচ্ছে, তার বিপরীতে জাতিসংঘ বা রেডক্রসের মতো নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট দালিলিক সমর্থন না দেওয়া সত্ত্বেও একে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা, তা আমাদের ইরাকের সেই তথাকথিত ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি অতিরঞ্জিত তথ্যকে বারবার প্রচার করে যখন সত্যের আদল দেওয়া হয়, তখন সেই ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার নেওয়ার মতো কেউ আর অবশিষ্ট থাকে না। লিবিয়া বা সিরিয়ার বর্তমান মানচিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাইরের হস্তক্ষেপে আসা ‘পরিবর্তন’ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কেবল শ্মশানের নীরবতাই বয়ে আনে। আজ যখন বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের (Multipolar World) ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক মুদ্রা সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে, তখন আমাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কারণ সার্বভৌমত্বহীন উন্নয়ন বা অভিভাবকহীন পরিবর্তন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা ইতিহাসের পাতায় নিষ্ঠুরভাবে লিপিবদ্ধ আছে।

​তবে মুদ্রার অপর পিঠের রূঢ় বাস্তবতা হলো, ইরানের সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাসের নেপথ্যে থাকা ক্ষোভের কারণগুলো কোনোভাবেই অমূলক নয়; জরাজীর্ণ অর্থনীতি আর কঠোর অভ্যন্তরীণ শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া জনতার আর্তনাদ সেখানে এক অমোঘ সত্য। কিন্তু ট্র্যাজেডিটি ঘটে তখনই, যখন এই অকৃত্রিম জনদাবিকে ‘হাইজ্যাক’ করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ১২ হাজার লাশের পাহাড় যদি কোনো সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা মেশিনের আবিষ্কার হয়, তবে তা বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসের জন্য এক কলঙ্কিত অধ্যায়; আর যদি তা ধ্রুব সত্য হয়, তবে তা বৈশ্বিক রাজনীতির এক চরম নৈতিক পরাজয়। এই আধিপত্যবাদী নীল নকশা কোনো সাময়িক বিভ্রম নয়, বরং এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। ইতিহাসের আয়নায় তাকালে দেখা যায়, পারস্যের সেই উত্তাল দিন থেকে আমাদের এই বদ্বীপের চুয়াত্তর কিংবা বর্তমানকাল—সবখানেই সাম্রাজ্যবাদের কৌশল এক, কেবল মুখচ্ছবি ভিন্ন। আজ যখন আমরা অ্যালগরিদম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডিজিটাল জাদুর মোহে আচ্ছন্ন, তখন মানবতার সবচেয়ে প্রাচীন অধিকার—’সার্বভৌমত্ব’—আজও আধিপত্যকামী শক্তির মর্জির ওপর বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে।

​সত্যিকারের মুক্তি কোনো বিদেশি জাহাজ বা গগনচুম্বী স্যাটেলাইটে চড়ে আসে না। ইতিহাস আমাদের নিষ্ঠুরভাবে শিখিয়েছে, যে জাতির ‘সম্মতি’ অন্যের ড্রয়িংরুমে উৎপাদিত হয়, তাদের স্বাধীনতার বনিয়াদ সবসময়ই কাঁচের ঘরের মতো ভঙ্গুর। বর্তমানের এই সংবেদনশীল মুহূর্তে বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই যে, প্রোপাগান্ডের এই নিশ্ছিদ্র কুয়াশায় নির্মোহ সত্য অনুসন্ধানই হলো প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠতম ভাষা। সাম্রাজ্যবাদের সেই চিরচেনা বিষদাঁত আজ চিনে রাখা জরুরি, যাতে ইতিহাসের কোনো পুনরাবৃত্তি জনপদগুলোকে আর কোনো নতুন বিষাদসিন্ধুর তীরে এনে দাঁড় করাতে না পারে। দিনের শেষে কোনো জাতির রক্তই যেন কোনো বৃহৎ শক্তির রণকৌশলের সস্তা উপাত্তে পরিণত না হয়—এটাই হোক সমকালীন রাজনৈতিক চেতনার সবচেয়ে বড় দালিলিক অঙ্গীকার।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED