এলজিইডির প্রকল্প কাগজে, টাকা মিরাজ দম্পতির ঘরে
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
কাগজে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্প, বাস্তবে কোথাও কাজের চিহ্ন নেই। অথচ সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সেই অর্থের শেষ ঠিকানা পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের ভাণ্ডার।
অনুসন্ধান শেষে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর পক্ষ থেকে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক দশকে এই দম্পতি চারটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই প্রায় ২৮০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁদের নামে পাওয়া গেছে অন্তত ১২২ কোটি টাকার অজানা ও আয় বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান।
মানিলন্ডারিং ও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুদক পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলাটি দায়ের করেছেন পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।
দুদকের ওই কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম মামলা দুটি তদন্ত করবেন বলে জানা গেছে।
প্রকল্প হয়নি, টাকা গেছে
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, মিরাজুল ইসলাম তাঁর মালিকানাধীন ইফতি ইটিসিএল (প্রা.) লিমিটেড, ইফতি এন্টারপ্রাইজ এবং সাউথ বাংলা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে এলজিইডির একাধিক প্রকল্পের বিল উত্তোলন করেন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে ৯টি ব্যাংকের মাধ্যমে অন্তত দুই হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এটি পরিকল্পিত মানিলন্ডারিংয়ের স্পষ্ট আলামত।
সম্পদের পাহাড়, আয়ের খাতায় ফাঁক
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরাজুল ইসলামের নামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকানসহ স্থাবর সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক আমানত, ব্যবসার মূলধন, কম্পানির শেয়ার এবং ৯টি গাড়ি মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য ১১৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি।
অথচ গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র ১৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। দায়-দেনার কোনো তথ্য না থাকায় প্রায় ৯৯ কোটি টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।
স্ত্রীর হিসাবেও গরমিল
মিরাজুল ইসলামের স্ত্রী শামীমা আক্তারও ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি মেসার্স শিমু এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর ও লাইসেন্সধারী ঠিকাদার। দুদকের অভিযোগ, তাঁর ক্ষেত্রেও এলজিইডির প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
শামীমা আক্তারের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অথচ তাঁর গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র সাত কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২৪ কোটি টাকার সম্পদ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
আরো গুরুতর অভিযোগ, তাঁর ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণে সরকারি অর্থ সংশ্লিষ্ট অন্তত ১২২ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে, যা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে।
মহারাজের ভাই মিরাজ
ছাত্রদলের হাত ধরেই রাজনীতিতে যাত্রা শুরু মহিউদ্দীন মহারাজের। এরপর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক এক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তবে মন্ত্রীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির জেরে জাতীয় পার্টি ছেড়ে ‘সোনার নৌকা’ প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
দল বদলের পর মহারাজের রাজনৈতিক উত্থান ছিল দ্রুত। অল্প সময়ের মধ্যেই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সাবেক মন্ত্রীকেই হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহিউদ্দীন মহারাজ। বারবার দল ও অবস্থান বদলে রাজনীতিতে নিজের রং পাল্টানো এই ব্যক্তিই আজ ক্ষমতাসীন দলে প্রভাবশালী মুখ।
এই মহারাজের ভাই হলেন মিরাজুল ইসলাম মিরাজ। তিনি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই মহারাজ পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্নের মুখে তদারকি ব্যবস্থা
দুদকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দম্পতির সম্পদ-আয়ের বৈষম্য, বিপুল অঙ্কের ব্যাংকিং লেনদেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুপস্থিতি একসঙ্গে সরকারি অর্থের অবৈধ ব্যবহার এবং আয়ের উৎস গোপনের সুপরিকল্পিত চিত্র তুলে ধরে। এতে স্থানীয় প্রশাসন, প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড়ের তদারকি ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
দুদক উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান। অনুসন্ধানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



Post Comment