পলিমাটির প্রজ্ঞা ও নক্ষত্রের কিংবদন্তি: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
বাহাউদ্দিন গোলাপ।।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)



Post Comment