প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়!
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
মাত্র ৫০ একর জমিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরেও মেলেনি অবকাঠামোসহ অন্যান্য কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। ১০ সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ধাপের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। দ্বিতীয় ধাপের উন্নয়ন কার্যক্রম কাগজে-কলমে শুরু হলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি এখনও। ফলে শিক্ষক, কর্মচারী, ক্লাসরুম, আবাসিক হল, পরিবহণ, স্বাস্থ্যসেবা, লাইব্রেরির বই, গবেষণা সরঞ্জাম, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন সংকট এখনও বিরাজ করছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই বিদ্যাপিঠে। এসব কারণে এখানকার শিক্ষার্থীরা আছেন নানান দুর্ভোগে। ফলে শুধুমাত্র কাগজে কলমেই আটকে আছে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র ‘পূর্ণাঙ্গ’ শব্দটি।
তথ্যমতে, উদ্বোধনের সময় ১৫টি বিভাগ চালুর কথা থাকলেও ২৫টি বিভাগ নিয়ে ববির কার্যক্রম চলছে। তখন প্রথম ধাপের উন্নয়ন কার্যক্রমে দুটি অ্যাকাডেমিক ভবন ও প্রশাসনিক ভবন, ছেলে এবং মেয়েদের দুটি করে চারটি আবাসিক হল, উপাচার্যের বাসভবন, দুটি ডরমেটরি, লাইব্রেরি, টিএসসি ও মসজিদ রয়েছে। প্রথম ধাপের উন্নয়ন কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। প্রথম ধাপের উন্নয়নে এখানে ৩৬টি শ্রেণি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই ৩৬টি শ্রেণিকক্ষেই এখনও চলছে ২৫টি বিভাগের পাঠদান। কক্ষ না পেয়ে প্রায়ই শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণ করতে হচ্ছে মাঠে বা বাগানে। এছাড়াও অবকাঠামোগত অন্যান্য সংকটের কারণে এখানকার শিক্ষার্থীসহ কর্মরতরা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে।
এই দুর্ভোগ কাটাতে দ্বিতীয় ধাপের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের জন্য ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর দ্রুত কাজ শুরুর দাবিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জমি অধিগ্রহণের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৪ তারিখ একদল শিক্ষার্থী আমরণ অনশনে বসেন। তখন শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙানোর সময় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম নিজে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ধাপের কাজের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির কাজ শেষ করবেন। এরপর ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ববির কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফকে পিডি (প্রজেক্ট ডিরেক্টর) হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পিডি নিয়োগের পাঁচ মাসে এখনও দৃশ্যমান কোন উন্নয়নকাজ দেখাতে পারেনি ববি।
এছাড়া ১৫ বছর পরও এখানে শিক্ষক সংকট চরমে রয়েছে। এখানকার অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী এই সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য মোট ৪৯৩ জন শিক্ষক থাকার কথা। অবশ্য এই সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় কম। তবুও ইউজিসি থেকে অনুমোদন পাওয়া (ছাড়কৃত) ২৬৬টির পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ২২৫ জনের মত। এর মধ্যে শিক্ষাছুটিতে আছেন ৫৪ জন শিক্ষক। প্রায় একই দুরবস্থা কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদেও। এখানে ইউজিসির ছাড় করা কর্মকর্তা কর্মচারীর পদ রয়েছে ৩৮১টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ১০৬টি পদ। এতে করে অ্যাকাডেমিক-দাপ্তরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
মাত্র দুটি অ্যাকাডেমিক ভবনে থাকা ২৮টিসহ প্রশাসনিক ভবনের ৮টি শ্রেণিকক্ষে চলে পাঠদান। রয়েছে মাত্র ৩২টি ল্যাব কক্ষ। এছাড়া বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের অফিস কক্ষ রয়েছে মাত্র ৬৮টি। ক্লাস রুম সংকট থাকায় প্রায়ই মুক্তমঞ্চ, খেলার মাঠ, ছায়াঘেরা বাগানে পাঠ গ্রহণ করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
ইউজিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৩৫টি গাড়ি কেনার কথা থাকলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ২৭টি। এর মধ্যে বাস ১৫টির মত বাস বাকিগুলো অন্যান্য যান। পরিবহণ সংকট থাকায় ছেলে এবং মেয়েদের দুটি করে চারটি আবাসিক হল রয়েছে। তাতে বর্তমানে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩১ হলেও বাস্তবে তা আরও কম। তাই বাধ্য হয়ে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীকেই থাকতে হয় ভাড়া মেসে। এছাড়া খাবারের মানও ভাল নয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এখানে ভর্তি হওয়ার সময় একজন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা বাবদ ৬শ টাকা করে দিতে হয়। একই সময় হেলথ কার্ড বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় আরও ১শ টাকা। একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে যদি ৫ বছরও থাকতে হয় তাহলে বছরে তার দেয়া টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪০ টাকা। এই টাকার বিনিময়ে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা বাবদ বরাদ্দ থাকে মাত্র ৭৯ টাকা! ফলে এখানে থাকা মেডিকেল সেন্টারটিতে জ্বর, সর্দি, কাশি আর ডায়রিয়া ছাড়া কোন রোগেরই চিকিৎসা হয় না।
এছাড়াও একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থাকলেও সেখানে রয়েছে বই সংকট। পাশাপাশি গবেষণা সরঞ্জাম, খেলার মাঠ সংকট নিয়ে চলছে এখানকার শিক্ষা কার্যক্রম। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ১৩ মে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মামুন আর রশিদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রায় নয় মাসেও এসব পদে কোনো নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ববির গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সংগঠক ও মৃত্তিকা বিভাগের শিক্ষার্থী সুজয় শুভ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে যেসমস্ত আয়োজনের দরকার পরে তা গত ১৫ বছরেও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এখানে বিভিন্ন সংকট দিন দিন বাড়ছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সংকট দূর করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, আমাদের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ বছর শেষ করে ১৬ বছরে পদার্পণ করেছে, যা আনন্দের। ববিতে অনেক চাওয়া-পাওয়া আছে। আমাদের প্রথম ধাপের উন্নয়ন কাজের পর দ্বিতীয় ধাপের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, কনসালটেন্ট নিয়োগের বিজ্ঞাপন প্রকাশ হয়েছে। অন্যান্য সংকট সমাধানে আমরা নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ রাখছি। দ্রুত ক্লাস রুম সংকটে অ্যাকাডেমিক ভবন ৩ নির্মাণ কাজ শুরুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রসঙ্গত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ৩৩তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে ববি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বরিশাল বিভাগে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।



Post Comment