প্রতিটি জেলার সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন’ থানা হিসেবে গড়ে তোলা হবে: আইজিপি
অনলাইন ডেক্স ।।
পুলিশের সঙ্গে জনগণের তৈরি হওয়া আস্থার সংকট কাটাতে প্রতিটি জেলার সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন’ থানা হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়ার অভিযোগে পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আজ সোমবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান আইজিপি। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর মো. আলী হোসেন ফকিরকে পুলিশের আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।
আইজিপি বলেন, ‘বিগত সময়ে পুলিশের সঙ্গে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জনআস্থা উদ্ধারে ও উদ্ধারে আমাদের সচেষ্ট থাকতে হবে। এজন্য জেলা সদরের থানাকে জিরো কমপ্লেইন থানা হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’
সেসব থানাতে একজন সার্কেল এএসপি ওই থানার কার্যক্রম সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবে জানিয়ে আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আমরা এমনভাবে জনগণকে সেবা দিতে চাই যাতে থানায় আগত মানুষ হাসিমুখে ফেরে। পুলিশের বিরুদ্ধে যাতে কোনো ধরনের কমপ্লেন না থাকে। পুলিশের রিঅ্যাকশন টাইম নূন্যতম পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে।’
আইজিপি বলেন, পুলিশ এমনভাবে জনগণকে সেবা দিতে চায়, যাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকে। তদন্তের গুণগত মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এমনকি উগ্র মৌলবাদীদের উত্থান রোধে পুলিশের ‘সজাগ দৃষ্টি’ থাকবে বলে জানান তিনি।
দেশের সংকটকালীন মুহূর্তে পুলিশের সবসময় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি মনে করিয়ে দেন আইজিপি।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের অঙ্গীকারের মতো দেশের স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশেরও‘অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার’ বলে ভাষ্য বাহিনী প্রধানের।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়ে আইজিপি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দলীয় কোন বিবেচনার সুযোগ নাই।’
আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘চাঁদাবাজদের তালিকা করা হয়ে গেছে। অচিরেই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে। তবে চাঁদাবাজদের সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারণ বিভিন্ন সংস্থা থেকে আমরা তালিকা পেয়েছি সেগুলোর মধ্যে কমনগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ব্লক রেড দিয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং চলমান আছে।’
চাঞ্চল্যকর কোনো ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শসহ যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, গণধর্ষণ, ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘সিআইডিকে আরও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে মামলা তদন্তের গুণগত মান বাড়াতে চাই। মামলার তদন্তকার দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’
হাদি হত্যায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দণ্ডিত আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে কাজ চলছে বলে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে। তারা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। হয়তো অচিরেই আমরা দেখতে পাব তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’
আসন্ন ঈদ নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘ঈদের সড়ক-মহাসড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। মহাসড়কে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দস্যুতা হতে দেওয়া হবে না।’
আইজিপি জানান, মহাসড়কে ডাকাতি রোধে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। র্যাব ও মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছে। দেশের প্রধান প্রধান মার্কেটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চুরি-ছিনতাই রোধে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঈদকে সামনে রেখে পোশাক শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা নিয়ে অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কা মাথায় রেখে পৃথক পরিকল্পনার কথা বলেছেন আইজিপি।
তিনি বলেন, ‘এমন গার্মেন্টস শিল্প চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি শ্রমিক নেতা, মালিক, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
উগ্র মৌলবাদীদের উত্থান রোধে পুলিশের সজাগ ও নজরদারি বজায় থাকবে বলেও জানান আইজিপি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ রাষ্ট্রের মূল শক্তি। তাই আমরা সবসময় জনগণের পাশে থেকে তাঁদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে বদ্ধপরিকর। জনবান্ধব পুলিশ গড়তে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’
৭ই মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অতিউৎসাহী ভূমিকা পালন করবে না। কিন্তু মব নির্মূল করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। তাহলে একটা অকার্যকর দেশে পরিণত হবে। দেশে আইনের শাসন বাস্তবায়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এই জন্য পুলিশ কাজ করবে। আর যারা নিষিদ্ধ সংগঠন, তারা নানা অজুহাতে রাস্তায় নেমে এসে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাবে, সন্ত্রাসকে উসকে দেবে এটা আমরা মেনে নেব না।’
সাম্প্রতিক মব সন্ত্রাস নিয়ে পুলিশের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘মব নির্মূলে পুলিশের অবশ্যই পরিকল্পনা আছে। আমাদের দেশে যে বেকারত্ব আছে, এর কারণে যেই সংগঠনই ডাক দেয় তাদের পায়। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গেও জড়িত হয়। আমরা মব তৈরি করা ব্যক্তিদের নির্মূল করতেছি, সে যত বড়ই হোক।’



Post Comment