এক দিনে তিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু!
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
দেশের তিনটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শিক্ষাঙ্গনে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দুই শিক্ষার্থী বিষাক্ত দ্রব্য পান ও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) এক শিক্ষার্থী মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে আকষ্মিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল ১০টায় বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ গৌরনদী উপজেলার ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেনের বড় ছেলে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে (ব্রেন স্ট্রোক) তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর অকাল প্রয়াণে পুরো বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা গেছে, গত ১৬ মার্চ শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইমতিয়াজকে ঢাকার একটি নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে গত ১ এপ্রিল চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। তবে বাড়িতে ফেরার মাত্র দুই দিনের মাথায় আজ সকালে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।
তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন অনেকে এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রাজধানীর হাজারীবাগের মনেস্বর রোডের ভাড়া বাসায় বিষাক্ত দ্রব্য পানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সীমান্ত (২৫) মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজধানীর হাজারীবাগের মনেস্বর রোডের ভাড়া বাসায় ‘বিষাক্ত দ্রব্য পানে’ সীমান্ত (২৫) নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ। তিনি ঢাবির রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দিনগত রাত দেড়টা নাগাদ অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানার এসআই জাহিদ হোসেন বলেন, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে আমরা খবর পেয়ে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসক জানিয়েছেন, নিহত শিক্ষার্থী ছারপোকা মারার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। হাজারীবাগের বাসায় দুজন মিলে একটি রুমে ভাড়া থাকতো। ঘটনার সময় সীমান্তের রমমেট বাইরে ছিল। পরে সীমান্তের স্বজনরাসহ দরজা ভেঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, করোনায় মায়ের মৃত্যু, বোন প্রতিবন্ধি। এসব বিষয় নিয়ে হতাশাগ্রস্ত থেকে ছাড়পোকা মারার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
নিহত শিক্ষার্থীর বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম সদরুল আমিন। বর্তমানে হাজারীবাগের মনেস্বর রোডের একটি বাসায় সাবলেট হিসেবে বসবাস করতেন।
মৃত শিক্ষার্থীর চাচা রুহুল আমিন বলেন, ‘আমার ভাতিজা হাজারীবাগের বাসায় সাবলেট ভাড়া থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত। তার রুমমেট জানায় গতরাত ৯টার পরে সীমান্ত তার রুমের দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেলেও তার কোন সাড়া–শব্দ না পেয়ে বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়। পরে বাড়ির মালিক এসে দরজা ভেঙে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান সীমান্ত আর বেঁচে নেই।’
রুহুল আমিন আরও বলেন, ‘অচেতন অবস্থায় সীমান্তকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মুখ থেকে বিষাক্ত দ্রব্যের গন্ধ বেরোচ্ছিল। এতে আমরা ধারণা করেছি ওই বিষাক্ত দ্রব্য খেয়েই সীমান্ত আত্মহত্যা করেছে। তবে কেন সে এই কাজটি করেছে তা আমরা কিছুই জানি না।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক বলেন, ওই শিক্ষার্থীকে রাতে অচেতন অবস্থায় আনা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি হাজারীবাগ থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।
এছাড়াও রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে তুরাগ থানার ডিউটিরত অফিসার এসআই ইখলাস মিয়া বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, খবর পেয়ে পুলিশ সকাল আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত নিশ্চিত করা যাবে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে একই বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ কাজল মিয়া জানান, সাবিত কয়েকদিন ধরেই মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিছু অস্বাভাবিক পোস্টও দিয়েছিলেন। গতকাল রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জানা যায়, তিনি নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনার সঠিক কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।



Post Comment