টানা বৃষ্টি : সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত, বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও কালবৈশাখীর প্রভাবে বরিশালের জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি, আবার কখনও মুষলধারে বৃষ্টিতে নগরীর সড়কগুলো ভিজে স্লিপারি হয়ে উঠেছে, কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। একই সঙ্গে সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত এবং নদী বন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল থাকায় নৌ-চলাচলেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে বরিশাল আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার মো. মাজহারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ৬৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ, বায়ুর চাপের তারতম্য এবং কালবৈশাখী ঝড়ের সম্মিলিত প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, আগামী আরও অন্তত তিন দিন এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
নগরীর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল এমন এলাকাগুলোতে, পানি জমে সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অফিস ও কর্মস্থলগামী মানুষ। অনেকেই ভিজে কাপড়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কোথাও কাদামাখা রাস্তায় চলাচল করতেও দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই এমন চিত্র নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। অপ্রতুল নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, ফলে দুর্ভোগ বাড়ে কয়েকগুণ।
অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদীপথে ছোট নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নৌযানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
আবহাওয়া অফিস সকলকে বজ্রসহ বৃষ্টির সময় খোলা জায়গায় অবস্থান না করা, গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নগর ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার না করলে ভবিষ্যতে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে বরিশাল জেলাজুড়ে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে গত দুইদিনের ভাড়ি বর্ষণে কৃষকের ক্ষেতে কাটা ধানগুলো পানিতে তলিয়ে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ভারি বর্ষণের সাথে বজ্রপাত হওয়ায় কৃষকেরা জমিতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
এদিকে গত দুইদিন ধরে ভারি বর্ষণে বোরো ক্ষেতে পানি জমে গেছে। এরসাথে দমকা হাওয়ায় জেলার অধিকাংশ উপজেলার পাকা বোরো ধান নুয়ে পরায় পাকা ধানগুলো পানির সাথে মিশে নস্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকেরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির সাথে ঘণ ঘণ বজ্রপাত হওয়ায় অনেকেই ঘরের বাহিরে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না।
জেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সময়ের অতিরিক্ত বৃষ্টি ফসলের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে পাকা বোরো ধানের ক্ষেত ও সবজি ক্ষেতে পানি জমে থাকলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্রমতে, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, বাবুগঞ্জ, আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী উপজেলায় টানা দুইদিনের ভাড়ি বর্ষণে বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরমধ্যে যেসব কৃষকরা ধান কাটার পর জমিতে রেখেছিলেন তাদের সেই কাটা ধান এখন বৃষ্টির পানির নিচে থাকলেও শ্রমিক সংকট ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে তা ঘরে তুলতে পারছেন না। ফলে কৃষকের চোখের সামনেই ডুবে রয়েছে তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর ঋণের টাকায় বোনা স্বপ্ন। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে ফসল ঘরে তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পরেছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগ থেকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ থাকলেও শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পরেছে।



Post Comment