Loading Now

বিএমপির ২৮৭ পুলিশ সদস্য অপরাধী চেনেন না !

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

গণ-অভ্যুত্থানের পর গত পাঁচ মাসেও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সময়ে বিএমপি কমিশনার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ৪০০ জনকে বদলী করা হয়। এর বিপরীতে বরিশালে পদায়ন করা হয় ২৮৭ জনকে। শূন্য পড়ে থাকে ১১৩টি পদ। পুলিশের এই রদবদলে মুখ থুবড়ে পড়ে শৃঙ্খলা কার্যক্রম। বর্তমানে যারা এখানে বদলী হয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন কমিশনার, একজন অতিরিক্ত কমিশনার, দুজন উপ পুলিশ কমিশনার, ৪জন অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার, ৭জন এএসপির বিপরীতে নতুন এসেছেন একজন, ২৪ জন ইন্সপেক্টর এবং ২৫৪ জন কনস্টেবল থেকে সাব ইন্সপেক্টর। এদের মধ্যে ২৭৮ জন ইন্সপেক্টর, সাব ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবল সরাসরি যারা এখানে যোগদান করেছেন তারা সবাই একেবারেই নতুন। আসামীরা এদের চিনলেও এরা এখনো স্থানীয় রাস্তাঘাট, এলাকা ও অপরাধীদের চিনে উঠতে পারেননি। এদের সোর্স এখনো উন্নত হয়নি। এলাকাবাসীর সাথেও জমেনি খাতির। এ অবস্থায় অপরাধ দমনে দ্রুত অপরাধী ধরার কাজটি মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। পুলিশের তালিকায় বরিশাল নগরীতে দাগি অপরাধীর সংখ্যা ৩০ জন হলেও এখানে একের পর এক অপরাধ ঘটছে। আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে জামিন পাচ্ছে অপরাধীরা।
নগরীর কাশিপুরে দীঘি, পুকুর, ড্রেন ও ডাস্টবিনে মিলেছে লাশের টুকরো।

কোতয়ালী থানার সামনেই যুবদল নেতা এবং গোরস্থান রোডে আ.লীগ নেতাকে হত্যার জন্য চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। নাজিরের পোল এলাকায় প্রকাশ্যে দুই বিএনপি নেতার বাড়িতে হামলা-ভাংচুর করেছে হেলমেট বাহিনী। অক্সফোর্ড মিশন রোডে একের পর এক কোপাকুপির ঘটনায় কেউ দারস্থ হয়নি থানা পুলিশের। চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে একের পর এক। এতে আতংকিত নগরবাসী। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন পুলিশ ন্যূনতম কার্যক্রম অবস্থায় নেই। ফলে থানায় আশ্রয় নিয়েও রেহাই মিলছে না। কেউ বলছেন পুলিশ খোঁজ পর্যন্ত নেয়না।

সন্ত্রাসী হামলার শিকার এক যুবক বলছেন, চলমান একটি খেলার আয়োজন নিয়ে চাঁদাবাজি না করার কথা বলতেই আমার উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করে সন্ত্রাসীরা। আমি আত্মরক্ষায় কোতয়ালী থানার সামনে একটি দোকানে আশ্রয় নিলে সেখানে ঢুকে হামলা করা হয়। আমি থানার মধ্যে দৌঁড়ে পালালে সেখানে তিনজন কনস্টেবলের সামনে আমাকে কোপানো হয়। শুধু তাই নয়, আমার মামলা নিয়ে যারা কাজ করছিলো তাদেরকেও হুমকি দেয়া হয়। এখনও তারা প্রকাশ্যে ঘুরছে, পুলিশ তাদের ধরছে না।

 

ক্ষতিগ্রস্ত অপর এক নারী বলছেন, ৯ জানুয়ারি রাতে আমার ভাইয়ের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়। নির্মমভাবে তাকে কোপানো হয়। আমরা আশা করেছিলাম পুলিশ এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত পুলিশ আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ করেনি।

চলমান এসব অপরাধ প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপুলিশের বক্তব্য হলো বরিশাল মেট্রো এলাকায় ২৫-৩০ জন দাগি অপরাধী রয়েছে। এসব ঘটনায় এদের সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। এসব ঘটনা রাজনৈতিক ও নিজস্ব কোন্দলে ঘটেছে। তাদের মতে বরিশালে অপরাধ নিয়ন্ত্রনে আছে।

বিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকসহ নানা অপরাধের হোতা দাগি আসামীর সংখ্যা এখানে ২৫ থেকে ৩০ জন। এরা যে নতুন করে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমাদের জানা নেই। যে সব ঘটনা ঘটছে তা হয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা নিজস্ব কলহ নিয়ে ঘটেছে। থানার মধ্যে কারো উপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। যারা মামলা করেছে তারা আর অগ্রসর হচ্ছে না। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে যোগাযোগ করেছে, অনেকে মামলা পর্যন্ত দেয়নি। ডাকাতিসহ বড় অপরাধ এখানে ঘটেনি, এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রনেই আছে।

কিন্তু পুলিশের এমন কথা মানতে নারাজ নগরীর সুশীল সমাজ। তাদের মতে শুধুমাত্র কেডিসি বস্তিতেই নারী-পুরুষ মিলিয়ে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান করলেও অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে অভিযানের খবর পৌছে যায়। মানুষ আতংকে রয়েছে, পুলিশ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। খোদ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে বরিশালের ৪ থানায় ২টি ডাকাতি, ১৬টি খুন, ১৪৩টি চুরি, ১৬৮টি নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ৪৭৪টি মাদকসহ ১৫২৯টি অপরাধ ঘটেছে। পুলিশ তৎপর হলে এমন অপরাধ অনেকটা কমে যেতো।

গত ৫ মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪ থানা এলাকায় ৬টি খুন, ৫৪টি চুরি, ৭৩টি নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ১৩২টি মাদকসহ ৫৪২টি অপরাধ ঘটেছে। এসময় গ্রেপ্তার হয়েছে ৯ শতাধিক।

একজন সুশিল সমাজের প্রতিনিধি বলছেন বরিশালের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন দু:খজনক তেমনি দায়িত্বরতদের এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব ক্ষোভের বিষয়। জনগন ভীতিকর অবস্থায় রয়েছে। অভিযোগ দায়ের না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ কিছু করছে না। অপরাধ ঘটলে পুলিশকে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিতে হবে, এটাই আইন। কিন্তু কোন ব্যাপারেই পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। এই সরকারের সময় এমন হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। পুলিশ বেতন ঠিকমতোই নিচ্ছে কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছে দায়িত্ব।

অপরজন বলেন, বরিশালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের যেমন সক্রিয় থাকা দরকার ছিলো তা নেই। এদের কাছ থেকে সাধারন মানুষ আইনী সহায়তাও পাচ্ছে না। ফ্যাসিবাদের দোসর এখনো রয়ে গেছে।
বরিশাল মেট্রোপুলিশের অপর সূত্র বলেছে পট পরিবর্তনের পর পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত মোট ৪০০ সদস্যকে বদলী করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ থানার ২৬ জন পরিদর্শক রয়েছেন। রয়েছেন ৩৫৯ জন সাব উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল। এদের স্থলে নতুন যারা এসেছেন সেই সব নতুনদের এলাকা ও অপরাধী চেনা, সোর্স তৈরিতে সময় লেগে যায়। এ কারনেই কিছু অসুবিধা হচ্ছে। তার পরেও পুলিশ গত এক বছরে বহু অপরাধীকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। সেখান থেকে তারা জামিন পেলে পুলিশের কিছু করার থাকে না।

উপপুলিশ কমিশনার রুনা লায়লা বলেন, সব ধরণের অপরাধ মোকাবেলার জন্য আমরা প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত। এখন আমরা সুসংঘটিত। আমাদের মধ্যে অনেকেই নতুন বদলী হয়ে এসেছে। নতুন এলে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে সমস্যা হয়। জনগনের সাথে সম্পর্ক গড়তেও সময় লাগে। এ সমস্যাও আমরা উতরে যাবো। আসামি ছেড়ে দেয়া আমাদের কাজ নয়। গত এক বছরে অন্তত ১৮শ অপরাধী গ্রেফতার করেছি। আমরা তাদের আইনের কাছে সোপর্দ করেছি। এর পরেও তারা জামিনে বের হয়ে আসলে সেখানেতো আমাদের কিছু করার থাকেনা। আমরা গ্রেফতার করছি কিন্তু পরবর্তিতে তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে।
আইনজ্ঞদের মতে পুলিশ ঠিকমতো ফরোয়ার্ডিং দেয়না, প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব করে বলেই আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। পুলিশের উদাসীনতাই অইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ।
বরিশালের সরকারি কৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এমনও নজির আছে যে আদালত নির্দেশ দেয়ার ২২ দিন পর পুলিশ মামলা নিয়েছে। এরপর মেডিকেল টেস্টে যায় আরো সময়। মামলার আলামত বলেতো কিছুই থাকে না। এই বিলম্বের জন্য যদি আসামি বের হয়ে যায় এ দায়িত্ব কার। মামলা গ্রহণ, তদন্ত সব কিছুতেই তাদের গাফেলতি আছে। পুলিশ মামলার সিডি পিপিকে না জানিয়ে আদালতে জমা দেয়। এছাড়া দাগি আসামীর সংখ্যা পুলিশ যা বলছে বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি আছে। পুলিশের গাফেলতিতেই আসামী জামিন পেয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পুলিশি কার্যক্রমের অস্থিরতারই প্রভাব পড়েছে শৃঙ্খলা রক্ষার উপর।

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED