হাসপাতাল মাঠে ট্রাকস্ট্যান্ড, বিএনপি নেতার নামে টাকা উত্তোলন
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
বরিশাল নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বরিশালের একমাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। হাসপাতালের পাশেই একটি খোলা মাঠ। এটি টিভির মাঠ হিসেবে পরিচিত। ওই মাঠের অর্ধেক জায়গা নিয়ে করা হয়েছে বরিশাল শিশু হাসপাতাল।
বাকি অর্ধেকে বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই ট্রাকস্ট্যান্ড বসানো হয়েছে।
মাঠটিতে বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাধিক ট্রাক রাখা হয়েছে। ওই ট্রাকগুলো দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আলু, পেঁয়াজ ও তরমুজ নিয়ে বরিশালে আসে। পূর্বে ট্রাকগুলো বরিশাল স্টেডিয়ামের আশপাশে রাখা হলেও সম্প্রতি তা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মাঠ দখল করে রাখা হচ্ছে।
ট্রাকচালকদের দাবি, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রতি রাতের জন্য প্রতিটি ট্রাকে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। ওই টাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের নাম করে তোলা হচ্ছে। আর যে ট্রাকগুলোর চালকরা টাকা না দিচ্ছে তাদের গাড়ির ব্যাটারিসহ টাকা, মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তবে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক এ বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন।
শনিবার বরিশাল বক্ষব্যাধি হাসপাতাল মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, অর্ধশত ট্রাক বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালের প্রবেশদ্বার আটকে এবং পুরো মাঠে রেখে দেওয়া হয়েছে। আর ওই ট্রাকগুলো থেকে টাকা তুলছেন স্থানীয় কিছু যুবক।
তাদের কাছে টাকা তোলার কারণ জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, এটা স্ট্যান্ড ফি। হাসপাতালের মাঠে কেনো ট্রাকস্ট্যান্ড করা হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে তারা উত্তেজিত হয়ে ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ওই যুবকদের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে ফারুকের বাড়ি। স্থানীয় ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সব নেতাকর্মীই তার অনুসারী। আর ওই স্থানে বাহির থেকে এসে দখলদারি বা চাঁদাবাজি করার মতো কেউ নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। তারা মনে করে, ফারুকের পরিবারের সদস্যরা ফড়িয়াপট্টি এলাকায় চালের ব্যবসায়ী হওয়ায় তাদের পরামর্শে এই মাঠটিতে ট্রাকগুলো রাখা হতে পারে।
ট্রাকচালকরা বলেন, নিরাপত্তার জন্য পোর্ট রোড, ফড়িয়াপট্টি ও আলু পট্টি ব্যবসায়ীদের পরামর্শ মতো তারা হাসপাতালের মাঠে এসে গাড়িগুলো রাখেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার গাড়ি রাখার পর থেকেই তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৩০০ করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রথমে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর করা এবং সঙ্গে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন জোরপূর্বকভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
জিতা এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানের ট্রাকচালক আল মামুন বলেন, ‘তারা কুষ্টিয়া থেকে আলু নিয়ে এসেছেন। বরিশালের আলু পট্টিতে আলু নামিয়ে শুক্রবার রাতে ট্রাক তারা এই হাসপাতালের মাঠে রেখেছেন। প্রতি রাতে তাদের ৩০০ করে টাকা দিতে হচ্ছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের। তবে ওই বিএনপি নেতা কে বা কারা তাদের নাম বলতে পারি না।’
রাইসা এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানের ট্রাকচালক সবুজ মিয়া বলেন, তারা তরমুজ নিয়ে এসেছেন বরিশালে। পোর্ট রোড বাজারে তরমুজ নামিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তারা গাড়িটি এখানে রেখেছেন। গত তিন দিনে তারা স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ৯০০ টাকা দিয়েছেন। তবে বিএনপির কোন নেতা টাকা নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাব বলেন, যারা এসেছেন তারা মহানগর বিএনপির নেতা মনিরুজ্জামান ফারুকের লোক বলে দাবি করেন।
আয়শা এন্টারপ্রাইজের ট্রাকচালক লামিম বলেন, শুক্রবার রাতে ফড়িয়াপট্টিতে চাল নামিয়ে তিনি এই হাসপাতাল মাঠে এসে ট্রাক রাখেন। রাত ৯টার দিকে ১০-১২ জন লোক এসে তাকে ট্রাক রাখা বাবদ ৩০০ টাকা স্ট্যান্ড ফি চান। তিনি তা না দিলে তার গাড়ির ব্যাটারিগুলো খুলে নিয়ে যায়। যারা টাকা চাইতে এসেছিলেন তারা দাবি করেন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুকের লোক।
বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, ‘বক্ষব্যাধি হাসপাতাল মাঠে ট্রাকস্ট্যান্ড করা হয়েছে। ওই স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে ঘটনা সত্য। তবে যারা আমার নাম ভাঙাচ্ছে তারা আমার লোক কি না সেই বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে। আর ওই স্ট্যান্ড কে বা কারা বসিয়েছে সেই বিষয়টিও খোঁজ নিতে আমি লোক পাঠিয়েছি। যেহেতু ওইখানে দুটি হাসপাতাল রয়েছে সেহেতু হাসপাতাল দুটির সামনের মাঠে ট্রাকের স্ট্যান্ড অশোভন তাই সেটি সারানোর ব্যবস্থা করছি ‘
বরিশাল বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান বান্না বলেন, ‘বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই অর্ধশত ট্রাক হাসপাতালের মাঠে প্রবেশ করে। আমি বাধা দিলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। স্থানীয়রা ঐ ট্রাক স্টান্ড করার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। আমি জেলা সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবহিত করেছি। বৃহস্পতিবার থেকে হাসপাতালে কোনো রোগীকে সেবা দিতে পারছি না।’
বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মঞ্জুর এ এলাহী বলেন, ‘ওই মাঠ হাসপাতালের নিজস্ব সম্পত্তি। সেখানে ট্রাক রাখা বা ট্রাক স্ট্যান্ড করার প্রশ্নই আসে না। আর বিষয়টি আমাকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক অবহিত করেন। ওই ট্রাকগুলো এখান থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছি।’
বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে মাঠে ট্রাক রাখা কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। আর যেহেতু হাসপাতালটি আমাদের মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের বাসভবন লাগোয়া সেহেতু বিষয়টি তিনিই দেখবেন। আর যদি ওই ট্রাকস্টান্ড করে কেউ মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে তবে তার উচিত তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া।
Post Comment