গৌরনদী প্রতিনিধি ।।
জনশ্রুতি আছে, কয়েকশ বছর আগে এক নিঝুম রাতে অলৌকিকভাবে মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠেছিল এই ইমারত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের চোখে এটি সুলতানি আমলের অনবদ্য স্থাপত্য, আর স্থানীয়দের বিশ্বাসে এটি ‘আল্লাহর কুদরত’। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রামে অবস্থিত ৯ গম্বুজের এই প্রাচীন স্থাপনাটি এখন দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম রহস্যময় ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে কসবা গ্রামে গেলেই চোখে পড়ে লালচে ইট আর পাথরের কারুকাজখচিত এই নয় গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। বর্গাকার এই স্থাপনাটি মূলত বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে পরিচিত।
কষ্টিপাথর ও বেলেপাথরের চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠামোটি। এর উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে খোদাই করা আছে নান্দনিক ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা। যদিও কোনো শিলালিপি না থাকায় এর সঠিক নির্মাণকাল জানা সম্ভব হয়নি, তবে এর নির্মাণশৈলী সাক্ষ্য দেয় যে, এটি প্রায় ৭০০ বছর আগে প্রখ্যাত সুফি সাধক খান জাহান আলী (রহ.) এর শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল।
মসজিদটিকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে ডালপালা মেলেছে রোমাঞ্চকর সব লোককথা। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, এটি কোনো মানুষের তৈরি নয়, বরং ‘এক রাতেই’এটি অলৌকিকভাবে দৃশ্যমান হয়েছিল।
আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো, মসজিদের পাথরের স্তম্ভগুলো থেকে এক সময় রহস্যময় তেল চুঁইয়ে পড়ত। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল, এই তেল ব্যবহারে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি মেলে। সেই বিশ্বাসের টানে আজও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
তবে মসজিদের বর্তমান খাদেম বাবুল ফকির বলেন, মানুষের ভক্তি থেকেই এসব গল্পের জন্ম। এক সময় মানুষ নিজেরা ভক্তি করে পিলারে তেল মাখত, পরবর্তীতে সেটিই লোকমুখে অলৌকিক তেল হিসেবে পরিচিতি পায়।
মসজিদ সংলগ্ন বিশাল পুকুরটি নিয়েও লোককথার শেষ নেই। প্রচলিত আছে, কয়েকশ বছর আগে এই পুকুরের পাড়ে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য থালা-বাসন চাইলে অলৌকিকভাবে তা পানি থেকে ভেসে উঠত। কিন্তু কোনো এক মানুষের অসাধুতা বা চুরির কারণে সেই ‘অলৌকিক ভাণ্ডার’চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে কসবা মসজিদ প্রাঙ্গণ। কেউ আসেন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের টানে, কেউবা আসেন আত্মিক প্রশান্তির খোঁজে। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে মোমবাতি ও আগরবাতি নিয়ে আসেন মানতকারীরা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারীদের জন্য এখানে রয়েছে নামাজের সুব্যবস্থা।
মানত পূরণ করতে আসা আছমা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, নাতির অসুস্থতার সময় মানত করেছিলাম। আজ নাতিকে সাথে নিয়ে আল্লাহর ঘরে শুকরিয়া জানাতে এসেছি। এখানকার পরিবেশ মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।
ইতিহাসবিদের কাছে এটি প্রাচীন বাংলার সুলতানি ঐতিহ্যের স্মারক, আর সাধারণের কাছে এটি পরম করুণাময়ের এক বিশেষ নিদর্শন। ইতিহাস আর অলৌকিকত্বের এই অপূর্ব সহাবস্থানই কসবা গ্রামের ‘আল্লাহর মসজিদ’কে করে তুলেছে অনন্য। এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক জীবন্ত দলিল।
















