বরিশালে বোরো মৌসুমে জ্বালানি সংকটে সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতায় চলমান জ্বালানী তেলের কৃত্রিম সংকটে প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে আবাদকৃত প্রায় ৪ লাখ হেক্টরে বোরো ধানে সেচ ব্যবস্থা নিয়ে কৃষকের মাঝে নানামুখি সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে মার্চে প্রায় ৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত কিছুটা আশার আলো দেখালেও তা স্বাভাবিকের কম। ডিজেল এখনো মাঠ পর্যায়ে বড় কোন সংকট তৈরী না করলেও ঈদের লম্বা ছুটিতে সুদূর পল্লী এলাকায় সরবরাহে বিঘœ ঘটে। সেচব্যবস্থা নির্বিঘ্নে রাখতে জ্বালানী সরবরাহে প্রশাসনিক নানা পদক্ষেপ গ্রহন করা হলেও পল্লী এলাকার জ¦ালানী ব্যবসায়ীরা এখনো অনেকটা নজরদারীর বাইরে রয়ে গেছে। পাশাপাশি ঈদের ছুটির কারণে গ্রামেগঞ্জে কিছুটা কৃত্রিম সংকট তৈরী হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে বরিশালের জেলা প্রশাসন জ্বালানী তেল নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। প্রতিটি জ্বালানী ডিপো থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশ সহ ভ্রাম্যমান আদালতও দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেছে।
এমনকি জ্বালানী তেল নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে বরিশালের বিভাগ ও জেলা প্রশাসন নিয়মিত মনিটরিং এর মাধ্যমে পল্লী এলাকা পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ নির্বিঘ্নে রাখার পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মাহফুজুর রহমান নিয়মিতভাবে সব জেলা প্রশাসকদের সাথে কথা বলে মাঠ পর্যায়ে জ্বালানী সরবরাহ নির্বিঘ্নে রাখার বিষয়টি মনিটরিং করছেন। তিনি সব জেলা প্রশাসকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন সহ সার্বক্ষনিকভাবে নজরদারীরও তাগিদ দিয়েছেন।
বরিশালের জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমনও বিষয়টি নিয়ে সব ইউএনও’দের সাথে নিয়িমিত যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছেন।
বিভাগীয় কমিশনার মাহফুজুর রহমান বলেন, ডিজেলের কোন ঘাটতি নেই। সরবরাহ ব্যবস্থাও অক্ষুন্ন ও নির্বিঘ্ন রয়েছে। এমনকি ঈদের দিন ব্যাতিত আগে পরের ছুটির দিনগুলোতেও বেশীরভাগ তেল ডিপো থেকে ডিজেল সরবরাহ নির্বিঘ্নে রাখা হয়েছে।
চলতি রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ৩ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টরে আবাদের মাধ্যমে প্রায় ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তোলার লক্ষ্য স্থির রয়েছে। গত ১৫ মার্চ বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বোরো রোপনের শেষ দিন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ অর্জিত হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর-ডিএই সূত্রে জানা গেছে। ফলে এবার বোরো ধান থেকে বরিশাল অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধারা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরো চাল ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশাবাদী মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা। তবে কৃষিবীদদের মতে ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তুলতে হলে আগামী দু’মাস ডিজেলের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার কোন বিকল্প নেই।
ডিএই’র তথ্যমতে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে মাঠে শুধু বোরো ধানের সেচাবাদে বর্তমানে যে প্রায় ৮৭ হাজার পাওয়ার পাম্প চলমান রয়েছে, তার প্রায় ৭৫ হাজারই ডিজেলচালিত। এসব পাম্পে গড়ে দৈনিক ৫ লক্ষাধিক লিটার ডিজেল প্রয়োজন। এ সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘœ রাখার পাশাপাশি সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখাই এখন সরকার সহ স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন কৃষিবীদরা। এখনো বরিশাল অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থার ৯০ ভাগেরও বেশী ডিজেল নির্ভর। ফলে উৎপাদন ব্যায়ও বেশী।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে ডিজেলনির্ভর সেচ ব্যবস্থায় ধানের উৎপাদন খরচের ২৯ভাগই সেচব্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে ২০০২ সাল থেকে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের বিদ্যুৎ বিলের ওপর সরকার ২০ভাগ ভর্তুকি দিয়ে আসলেও ডিজেলচালিত সেচ যন্ত্রের জ্বালানী ব্যায়ে কোন ভর্তুকি নেই। ফলে সেচব্যায়ের কারণে এ অঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যায় সব সময়ই বেশী হওয়ায় কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছেনা।
বিগত খরিপ-২ মৌসুমে এ অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধারা প্রায় ২৪ লাখ টন আমন চাল ঘরে তুলেছেন। বর্তমানে এ অঞ্চলের মাঠে আরো প্রায় ৫৮ হাজার হেক্টরে গম কর্তনও প্রায় শেষ পর্যায়ে। সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ২লাখ টন গম কৃষকের ঘরে উঠবে বলেও আশা করা যাচ্ছে। কিন্তু এখন সেচ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখার মাধ্যমে ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তোলাই বড় চ্যলেঞ্জ।
এসব বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার জানিয়েছেন, এ অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধারা বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। সেচব্যবস্থা অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে যা প্রয়োজন সবই করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তারমতে, চলতি রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে এখনো বৃষ্টির কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। টানা ১২৭ দিন পরে গত ৯ মার্চ প্রথম সামান্য বৃষ্টি হলেও গত নভেম্বর থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে কোন বৃষ্টির দেখা মেলেনি। তবে চলতি মাসে আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসকৃত ৩৫-৫০ মিলি বৃষ্টি হলে তা হবে বোরোধানের জন্য আশীর্বাদ। এতে কৃষকের সেচব্যায়ও অনেকটা হ্রাস পাবে বলে জানান তিনি। তারমতে, প্রাথম দিকে যেসব বোরো রোপন হয়েছে তা ইতোমধ্যে থোর পর্যায়ে। ১৫ মার্চ এ অঞ্চলে বোরো রোপন শেষ হয়েছে। সে হিসেবে আগামী দুমাস বোরো জমিতে সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই। আর সে লক্ষ্যে ডিজেল ও সার সহ সব উপকরনের সরবরাহ অক্ষুন্ন ও নির্বিঘœ রাখার ওপরও জোর দেন এ কৃষিবীদ।
তবে দক্ষিণাঞ্চলের সেচ ব্যবস্থা সোলার ও বিদ্যুতায়িত করার ওপরও জোর দিয়েছেন একাধিক কৃষিবীদ। সারা দেশের মধ্যে বরিশাল কৃষি অঞ্চলেই এখনো সেচব্যবস্থা পরিপূর্নভাবেই ব্যায়বহুল ডিজেলনির্ভর। ফলে অতিরিক্ত সেচ ব্যায়ের কারণে এ অঞ্চলের কৃষকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা।



Post Comment