বরিশাল নগরীর পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি চলছে। কোনো প্রতিবাদেও ঠেকানো যায়নি আয়োজকদের। পুরো মাঠ ঘেরাও করার পর সেখানে স্টল স্থাপনের কাজ চলছে। এমনকি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের প্রায় ১৫ ফুটের মধ্যেই বসানো হচ্ছে গণশৌচাগারের স্ল্যাব।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের পরেশ সাগর মাঠে এই চিত্র দেখা গেছে। নগরবাসীর অতি পরিচিত মাঠ ও আশপাশের উন্মুক্ত এলাকার মালিক বরিশাল জিলা স্কুল। এটির দক্ষিণ পাশে জেলা পুলিশের মালিকানাধীন বিশাল জলাশয়টি পরিচিত পরেশ সাগর নামে। মাঠ-সংলগ্ন জিলা স্কুলের কলেজ শাখার অব্যবহৃত ভবনে অবস্থিত কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাস। পশ্চিম পাশে সরকারি আলেকান্দা কলেজ এবং সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। এ প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষার্থীরাও পরেশ সাগর মাঠ ব্যবহার করেন। উত্তর পাশে হালিমা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। এ ছাড়া মাঠ লাগোয়া ভিআইপি আবাসিক এলাকা ব্রাউন কম্পাউন্ড, গোড়াচাঁদ দাস রোড, বটতলা এলাকাসহ আশপাশের বাসিন্দা শিশু-কিশোররা এ মাঠে খেলাধুলা করে।
গতকাল দুপুরে দেখা যায়, চারদিকের সীমানা ঘেঁষে স্টল তৈরি করে মাঠ আটকে দেওয়া হয়েছে। স্টলে স্টলে চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। নানা ধরনের খেলনা স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের কিছু শিক্ষার্থীকে সেখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। কিছু শিশু শিক্ষার্থী ৫০ টাকার বিনিময়ে রাইফেলের গুলি দিয়ে বেলুনে লক্ষ্যভেদ করছিল। কালেক্টরেট স্কুল ভবনের আনুমানিক ১৫ ফুট দূরে মেলায় আগত জনতা ও ব্যবসায়ীদের জন্য শৌচাগার স্থাপনের কাজ চলছে। শ্রমিকরা জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে মেলার উদ্বোধন হবে বলে শুনেছেন।
কালেক্টরেট স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সরকারি মুলাদী কলেজের সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, তিনতলা শ্রেণিকক্ষ ভবনের যেদিকে জানালা, সেই পাশেই শৌচাগার বসানো হচ্ছে। মেলা শেষের ছয় মাসেও এখান থেকে দুর্গন্ধ যাবে না। এখানে মেলার অনুমতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। কালেক্টরেট স্কুলের সভাপতিও তিনি। তাঁর উচিত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা।
কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অলিউল ইসলাম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। দিনে গড়ে ১২০০-১৩০০ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। মেলা কমিটি শ্রেণিকক্ষের পাশে রিং বসিয়ে কয়েকটি অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করছে। মেলার শত শত ব্যবসায়ী ও দর্শনাথী এগুলো ব্যবহার করবেন। এতে যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হবে, তা মেলা শেষ হওয়ার ছয় মাস পরও অব্যাহত থাকবে। বিষয়টি তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও চেম্বারের সভাপতিকে জানিয়েছেন।
মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বরিশাল চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ। এই সংগঠনের একটি সূত্রে জানা গেছে, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেলা শুরুর কথা ছিল। এসএসসি পরীক্ষার কারণে পেছানো হয়েছে। ২০ মে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলেই মেলা উদ্বোধনের লক্ষ্য তাদের।
গোড়াচাঁদ সড়কের বাসিন্দা মুরাদুল ইসলাম হিমেল বলেন, এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে মেলার আয়োজন নিয়ে এলাকার লোকজন আপত্তি তোলেন। কিছুদিন আগে তারা গিয়ে মেলার
স্টল নির্মাণে বাধা দেন। এরপর মেলার আয়োজকরা জানিয়েছেন, এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে মেলা শুরু করবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির পক্ষে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রণি সিকদার ১০ মে হাইকোর্টে রিট করেছেন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, মেলার অনুমতি বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে তারা লিখিত আবেদন ও আইনি নোটিশ দিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি আমলে নেননি।
জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, পরেশ সাগর মাঠ জিলা স্কুলের। পাশের কালেক্টরেট স্কুল ভবন ও উন্মুক্ত জায়গাও জিলা স্কুলের সম্পত্তি। মাঠে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ সারাবছর বিভিন্ন খেলার আয়োজন হয়। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক জিলা স্কুলের সভাপতি। তিনি মেলার জন্য মাঠ বরাদ্দ দিয়েছেন। সেখানে মেলার জন্য শৌচাগার করা হয়েছে কিনা– তা জানা নেই। বিদ্যালয়ের সভাপতি বিষয়টি দেখবেন।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবায়দুল হক চানের দাবি, পরেশ সাগর মাঠ স্কুলের সম্পত্তি নয়। বাণিজ্য মেলা নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, এর সঙ্গে সাংবাদিকরাও জড়িত। একজনকে দিলে ১০ জন আসেন। মেলার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যে ব্যক্তি রিট করেছেন, তিনি পিরোজপুর জেলার কাউখালীর বাসিন্দা। তিনি মেলা নিয়ে আপত্তি জানানোর কে? তবে বিদ্যালয় ভবনের পাশ থেকে শৌচাগার সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন চেম্বার সভাপতি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) সালমা পারভীনের মোবাইল ফোনে গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েক দফায় কল দিলেও তারা ধরেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়েদুল্লাহকে কল করা হলে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন তিনি।
















