অনলাইন ডেক্স ।।
ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে সোমবার নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন হুমকি দিয়েছে, দেশটির ওপর এ যাবৎকালের ‘সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক আক্রমণ’ চালানো হবে।
এর জবাবে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ চলতে থাকলে’ তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব ধরনের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ওপর প্রায় নিরবচ্ছিন্ন মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তবে আরও কঠোর পদক্ষেপ উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
রবিবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসসে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী মতামতে বেসেন্ট লেখেন, ‘ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই শুরু হচ্ছে এক অর্থনৈতিক ডি-ডে—কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক আঘাত।’
যুদ্ধরত দুই দেশ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানো থেকে বিরত থাকলেও, ছয় মাসব্যাপী চলা এই সংঘাতের অবসানে কোনো কার্যকর আলোচনাতেও অংশ নেয়নি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হামলায় ইরানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দেশটির ওপর অর্থনৈতিক আঘাতও এসেছে।
তা সত্ত্বেও, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালানো ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ইরান এখনও ধরে রেখেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, বড় চাপ তৈরি হয়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওপর।
সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের বিস্তারিত উল্লেখ না করে বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেসব ‘ভীতসন্ত্রস্ত দেশ’ ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে ‘তোষণ নীতি’ অবলম্বন করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনবে।
এদিকে ইরানও কয়েক দিন ধরে এই নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এবং বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ইঙ্গিত দিয়ে একের পর এক কড়া বিবৃতি দিচ্ছে।
রোববার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পাল্টা আঘাত হানার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই লেখেন, ‘এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে’ হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের কোনো জায়গা দিয়েই ‘এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে ইরান যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে গণ্য করবে।’
এর আগে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন বেসেন্ট। তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই চীনের মোট তেল আমদানির অর্ধেক আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। তবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’ তিনি কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানান।
আগে থেকেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে ছিল। এখন চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তেহরান প্রকাশ্যে অনমনীয় অবস্থান বজায় রাখলেও, ইরানি কর্মকর্তারা সতর্কবার্তা দিয়েছেন—নতুন অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে, নতুন করে অসন্তোষও উসকে দিতে পারে।
যুদ্ধের আগেই ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও কাঠামোগত দুর্বলতার সমস্যা ছিল। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, বিঘ্নিত বাণিজ্য, উৎপাদন ক্ষতি ও যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনের ব্যয়ভার মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ।
গত জুনে সুইজারল্যান্ডে শেষ বৈঠকের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। এই অচলাবস্থার মধ্যে কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক সমাধান এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরান জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনির সোমবার তেহরান সফর করবেন। তবে সফরের বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তান এ সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিসহ সাম্প্রতিক সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন জেনারেল মুনির।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।