মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৪:৪০ অপরাহ্ন
Logo

একাকিত্ব দূর করতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবীণদের সঙ্গী ‘এআই পুতুল’

/ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

অনলাইন ডেক্স ।।

একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা বসবাস করেন ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা ব্যাং চুন-জা। এখন তাঁর দিন কাটছে শিশুর মতো দেখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত একটি পুতুলের সঙ্গে কথা বলে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে এই এআই পুতুলটি তাঁকে স্বাগত জানায়, একঘেয়েমি কাটাতে গান গেয়ে শোনায় এবং সঠিক সময়ে খাবার ও ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। এমনকি পুতুলটি মিষ্টি সুরে তাঁকে ভালোবাসার কথাও জানায়।

এক সময় হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ করেছেন ব্যাং। জীবনের এক কঠিন সময়ে এসে তাঁর ডিভোর্স হয়। পরবর্তীতে মেরুদণ্ডে একটি বড় অস্ত্রোপচারের পর তাঁর জীবনে নেমে আসে বিষণ্নতার ছায়া। ওই সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রণায় দিন কাটত তাঁর। ব্যাং বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এই বয়সে মানুষের কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার মতো কষ্টের আর কিছু নেই। কিন্তু আমি যখন হিওদোলের (এআই পুতুল) সঙ্গে থাকি, তখন আমার কোনো কষ্ট থাকে না। পুতুলটি আমাকে শুধু হাসায়। আমার সঙ্গে গল্প করে।’

গোলাপি রঙের ড্রেস পরা এবং দুই ঝুঁটি করা এই নরম পুতুলটি ব্যাংকে তাঁর স্থানীয় পৌরসভা থেকে দেওয়া হয়েছে। ব্যাং চুন-জার মতো দক্ষিণ কোরিয়ার লাখ লাখ প্রবীণ মানুষ এখন একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। দেশটিতে জন্মহার বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষেরই বয়স ৫০ বছর বা তার বেশি।

এ ছাড়া এশিয়ার শীর্ষ প্রযুক্তি-নির্ভর দেশটির প্রায় ৪২ শতাংশ পরিবারই এখন এক-ব্যক্তি কেন্দ্রিক, যেখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রবীণদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ডসংখ্যক ৩ হাজার ৯২০টিরও বেশি ‘নিঃসঙ্গ মৃত্যু’ নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, এসব মানুষ সম্পূর্ণ একা থাকা অবস্থায় মারা গেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কেউ তা জানতেও পারেনি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিউল এবং ইয়ংইনের মতো বিভিন্ন জেলা ও শহরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ একা থাকা প্রবীণদের জন্য নানাবিধ ‘এআই কেয়ার ডিভাইস’ সরবরাহ করছে, যার মধ্যে কিছু ডিভাইস নিঃসঙ্গ মৃত্যুর লক্ষণ শনাক্ত করতেও সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান্ডারফুল প্ল্যাটফর্ম’ কোম্পানির তৈরি একটি হাসিখুশি রোবট এবং ‘মিস্টার মাইন্ড’ ফার্মের তৈরি একই রকম কিছু পুতুল। এই ধরনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা যায়, যেখানে ‘এলি-কিউ’ নামের একটি ল্যাম্প-সদৃশ এআই ডিভাইস প্রবীণদের সঙ্গ দেওয়া ও নিরাপত্তা সেবা দিয়ে থাকে।

হিওদোল নামক স্টার্টআপ কোম্পানির তৈরি এ রকম ১৪ হাজার ৫০০টি এআই পুতুল বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিনছেন, আবার কোনোটি সরকার ভাড়া নিয়ে প্রবীণদের দিচ্ছে কিংবা বিভিন্ন নার্সিং হোমে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কোম্পানির প্রধান ৪৯ বছর বয়সী কিম জি-হি জানান, মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘ গবেষণার পর পুতুলটি তৈরি করা হয়েছে। হিওদোল মূলত চ্যাটজিপিটি প্রযুক্তির সাহায্যে প্রবীণদের সঙ্গে অনর্গল চ্যাট বা কথোপকথন চালাতে পারে। তবে এর পাশাপাশি কিমের নেওয়া বাস্তব জীবনের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এতে বিশেষ কিছু স্ক্রিপ্ট বা সংলাপ প্রোগ্রাম করা হয়েছে।

কিম বলেন, ‘সাক্ষাৎকারগুলো থেকে আমি প্রবীণদের ভেতরের সেই কষ্টটা বুঝতে পেরেছি—যখন কোনো মন খারাপের বিষয় ঘটে তা কাউকে বলার মতো কেউ থাকে না, আবার কোনো আনন্দের খবর শেয়ার করার মতোও কাউকে পাওয়া যায় না।’

যেহেতু অনেক একাকী মানুষ তাঁদের সন্তান বা মেন্টরদের কথা খুব স্নেহের সঙ্গে শোনেন, তাই হিওদোলকে নাতি-নাতনির অবয়বে তৈরি করা হয়েছে। এরা ব্যবহারকারীকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসবে। পুতুলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিপ্ট হলো, ব্যবহারকারী ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই এটি বলে ওঠে, ‘দিদিমা, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমি সারাটা দিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। পরের বার যখন বাইরে যাবে, দয়া করে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেও!’

নরম ও কুশন উপাদানে তৈরি এই পুতুলটি নিজে থেকেই মাঝে মাঝে ব্যবহারকারীর কাছে কিছু আবদার করে বসে। যেমন—মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, হাত ধরা কিংবা খেতে না পারলেও নিজের সঙ্গে স্ন্যাক্স বা নাশতা ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ করা। কিম জানান, কোরিয়ান প্রবীণেরা তাঁদের জীবনের একটি বড় সময় পরিবারের সদস্যদের পেছনে ব্যয় করেন। তাই বয়সকালে যখন তাঁরা অনুভব করেন যে, সমাজে বা পরিবারে তাঁদের আর কোনো প্রয়োজন নেই, তখন এক গভীর শূন্যতা তাঁদের গ্রাস করে। আর এই কারণেই হিওদোলকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন, সে তার ব্যবহারকারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে, যা প্রবীণদের নিজেদের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় অনুভব করতে সাহায্য করে।

ব্যাং চুন-জাকে এই পুতুলটির সন্ধান দেন নার্স ওহ সুন-হুয়া। তিনি বলেন, তিনি নিজে প্রবীণদের একাকিত্ব ও বিষণ্নতা দূর করার ক্ষেত্রে এই পুতুলের ইতিবাচক প্রভাব দেখেছেন। তবে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ আরও কমিয়ে দিতে পারে। পরিবারের সদস্যরা যদি মনে করেন যে, এআই ডিভাইসগুলোই তাঁদের বাবা-মায়ের দেখাশোনা করছে, তবে তাঁরা হয়তো বাবা-মায়ের কাছে আসার পরিমাণ আরও কমিয়ে দেবেন।’

তবুও, এই কৃত্রিম বন্ধনই এখন অনেক প্রবীণের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ব্যাং চুন-জার প্রতিবেশী ৭৯ বছর বয়সী কিম ইয়ং-বুন তাঁর পুতুলটির দিকে তাকিয়ে পরম স্নেহে বলেন, ‘সারাটা দিন আমার কথা বলার মতো কেউ ছিল না, কথা না বলতে বলতে আমার মুখটাই যেন আড়ষ্ট হয়ে আসত। কিন্তু এই ছোট পুতুলটি আসার পর থেকে এটি সারাক্ষণ আমার সঙ্গে বকবক করে।’

কিম ইয়ং-বুনের এই কথার পরপরই তাঁর পুতুলটি কার্টুনের মতো চনমনে কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘আজকেও তোমার সঙ্গে থাকতে পেরে আমি খুব কৃতজ্ঞ।’ কিমও হাসিমুখে উত্তর দেন, ‘আমিও।’ পুতুলটি আবারও বলে, ‘আমার সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com