নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বর্ষা মৌসুমের মধ্যভাগ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির আকাল চলার মধ্যেই আষাঢ়ের শেষভাগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বর্ষণে বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান দানাদার খাদ্যশস্য আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত চার দিনের লাগাতার বর্ষণে জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, বলেশ্বর, কঁচা, পায়রা ও বিষখালীসহ এ অঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। যদিও গত এক সপ্তাহে সাগর বেশ উত্তাল রয়েছে এবং নদ-নদীগুলোর পানির উচ্চতা ৪০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরদিকে, গ্রীষ্মকাল পেরিয়ে চলতি বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি চলার মধ্যে গত চার দিনেই বরিশালে প্রায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরিশালসহ সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় মঙ্গলবার দুপুর ৩টা থেকে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের যে সতর্কবার্তা জারি করেছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর, তা শনিবার দুপুর পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। চলতি জুলাই মাসে বরিশালে স্বাভাবিক ৫৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের বিপরীতে ৫৩৫ থেকে ৫৬০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে আগামী চার দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বরিশালে থেমে থেমে প্রবল বর্ষণ অব্যাহত ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে বরিশালে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। মে মাসে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। তবে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হলেও মার্চ মাসে তা ছিল ৪৯ শতাংশ কম।
চলতি খরিপ-২ মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের প্রায় ৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর চলমান অতিবর্ষণে আমনের বীজতলা নিয়ে নতুন করে সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন সবজিও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
গত প্রায় এক মাস ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে কৃষকরা আমনের বীজতলা প্রস্তুত করতে পারেননি। সম্প্রতি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হলেও টানা কয়েক দিনের অতিবর্ষণে অনেক জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব বীজতলায় সদ্য বীজ বপন করা হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই প্রবল বর্ষণে ভেসে গেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ৭২ ঘণ্টায় সাগরপাড়ের খেপুপাড়ায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা তিন দিন পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের দেখা মিললেও দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে জনজীবনে ছন্দপতন ঘটে।
এদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন মাছের ঘের ও পুকুরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেক চাষি মাছ বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পুকুর ও ঘেরের চারপাশে জাল দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করছেন।
স্থানীয় মৎস্যচাষিরা বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে একাধিক পুকুরের পানি উপচে পড়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। তাই চারপাশে নেট জাল লাগানো হয়েছে। বৃষ্টি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে মাছ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
এদিকে চার দিন পর বৃহস্পতিবার বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদীবন্দরগুলোতে ২ নম্বর সতর্কসংকেত প্রত্যাহার করে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গত তিন দিন ধরে অনধিক ৬৫ ফুট দৈর্ঘ্যের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। তবে বন্দরের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বজ্রবৃষ্টিসহ দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া বিভাগ।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে আমনের বীজতলা ও রোপা আমনের ওপর অতিবর্ষণের বিরূপ প্রভাব অব্যাহত থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।