কুয়াকাটা প্রতিনিধি ।।
একসময় ঈদ, পূজা কিংবা দীর্ঘ ছুটির মৌসুম এলেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা। হোটেল-রিসোর্টে কক্ষ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটে থাকত উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চেনা চিত্র ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত অবনতি, সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতায় ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারাচ্ছে সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং শতকোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগে।
কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খান স্টোরের মালিক মাসুম বলেন, গত বছরের কোরবানির ঈদের পরের ১৫ দিনে তাঁর দোকানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর একই সময়ে বিক্রি নেমে এসেছে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায়।
তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে ধারদেনা করে দোকানে মালামাল তোলা হয়। পর্যটকদের কাছে বিক্রির টাকায় সেই দেনা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এবার পর্যটক কম থাকায় বিক্রিও কম হয়েছে।
বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত হিসেবে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ থাকায় কুয়াকাটার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ঘাটতি এখন স্পষ্ট।
স্থানীয় হোটেল ও রিসোর্ট মালিকেরা জানান, কয়েক বছর আগেও ছুটির মৌসুমে অধিকাংশ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ শতভাগ বুকড থাকত। বর্তমানে অনেক সময় অর্ধেক কক্ষও পূরণ হয় না। তাঁদের মতে, সৈকতের পরিবেশ, সেবার মান এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
পর্যটকদের অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে সৈকতের পরিচ্ছন্নতা। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক, পলিথিন, পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া উপকূল রক্ষায় স্থাপিত জিওব্যাগ ও কংক্রিটের কাঠামোও সৈকতের নান্দনিক সৌন্দর্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন অনেক পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু পর্যটন নয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সৈকতজুড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সৈকতে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল এবং ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধিও পর্যটকদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক রাসেল মিয়া বলেন, মাছের জন্য বিখ্যাত এলাকায় এসেও অনেক রেস্তোরাঁয় নিম্নমানের বা বাসি মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে। অথচ দাম অত্যন্ত বেশি। এমন অভিজ্ঞতা পর্যটকদের হতাশ করে।
সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড বিলাসের জেনারেল ম্যানেজার আল-আমিন উজ্জ্বল বলেন, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার পরের ১০ দিনে তাঁদের রিসোর্টে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে একই সময়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বুকিং পেতেও বেগ পেতে হয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু পর্যটক কমে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এসব বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অপূর্ব রায় বলেন, পর্যটক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রথম ধাক্কা সামলাতে হবে পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। পরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা) কুয়াকাটার আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, কুয়াকাটা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় ও সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা। অপরিকল্পিত স্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, কুয়াকাটার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। সৈকতের নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনতে জিওব্যাগ ও কংক্রিটের কাঠামোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আচরণগত উন্নয়নে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটা আবারও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠবে।