অনলাইন ডেক্স ।।
কোরবানির আগে আদার বাজারে আগুন লেগেছে। মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আদা বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। পাঁচ দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি আদায় দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় কেরালা আদা না আসায় বাজারে চায়না আদার দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।
অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে গুটিকয়েক আমদানিকারক বন্দর থেকে নিয়মিত খালাস না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে পাইকারি বাজারে আদার দাম বাড়ানো হচ্ছে।
আদার মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
গেলো বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ও শুক্রবার (১৫ মে) দেশের ভোগ্যপণ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের আড়তদার ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার থেকে খাতুনগঞ্জে চায়না আদার দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা বেড়েছে। শুক্রবারও ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা কেজিতে আদা বিক্রি হতে দেখা গেছে। শনিবার সকালে আদার কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
চাক্তাই এলাকার আড়তদার মেসার্স বশর অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর বলেন, শনিবার চায়না আদা ২১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদ উল্লাহ মিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু তৈয়্যব বলেন, ‘ কয়েকদিন আগেও প্রতিকেজি চায়না আদা ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিন-চারদিন থেকে দাম হু হু করে বেড়েছে। গত সোমবারও ১২০ কেজি টাকা ছিল। শুক্রবার ১৮০ টাকা কেজিতে আদা বিক্রি হয়েছে। সামনে আরও বাড়তে পারে। তবে বেশ কয়েকমাস ধরে আমদানিকারকরা লোকসানে আদা বিক্রি করেছেন।’
কোরবানির আগে দাম কমার তেমন আশা নেই এমন দাবি খাতুনগঞ্জের লামার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিসের।
তিনি বলেন, ‘চলতি বছরে চায়না আদা আমদানি করে আমদানিকারকরা ধারাবাহিক লোকসান দিয়েছেন। অনেক আমদানিকারক পুঁজিহারা। যে কারণে গত কয়েকমাসে অনেকে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারেননি। এখন বাজারে কেরালা আদা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে পুরো বাজার চায়না আদা নির্ভর হয়ে পড়েছে। যে কারণে দাম বাড়ছে। এখন যারা নতুন করে এলসি খুলবেন সেগুলো কোরবানির আগে আসার সুযোগ নেই।’
মো. ইদ্রিস বলেন, ‘চায়না আদা কেজিতে ১১০ টাকা কস্টিং হচ্ছে। এপ্রিল মাসেও কস্টিংয়ের চেয়ে কম দামে আদা বিক্রি করতে হয়েছে। এগুলো পচনশীল পণ্য। বন্দর থেকে খালাস নেওয়ার পরপরই বিক্রি করে ফেলতে হয়। হিমাগারে রাখলে কস্টিং আরও বেড়ে যায়।’
গত বুধবার (১৩ মে) ‘এমভি হাই ইয়ান’ নামের একটি জাহাজ ১ হাজার ২৮১টি কনটেইনার পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এর মধ্যে ২৬ কনটেইনারে আদা রয়েছে।জাহাজটি শুক্রবার বন্দরের এনসিটিতে বার্থিং করার কথা। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘এমভি সিএনসি ভেনাস’ জাহাজেও আসে ৩৮ কনটেইনার আদা।
এর আগে গত ৯ মে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে কনটেইনার খালাস করে ‘এমভি এসআইটিসি শ্যাংমিং’। জাহাজটিতে ২৩ কনটেইনার আদা ছিল। পাশাপাশি চায়না থেকে নিয়মিত আদা আসছে চট্টগ্রাম বন্দরে। স্বাভাবিকভাবে প্রতি কনটেইনারে ২৭ টনের কিছু বেশি আদা থাকে।
এমভি সিএনসি ভেনাসে আসা ৩৮ কনটেইনার আদার মধ্যে ৭ কনটেইনার রয়েছে আমদানিকারক মেসার্স অপু এন্টারপ্রাইজের। এমভি হাই ইয়ানেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ৩ কনটেইনার আদা।
এসব আদার অবস্থান এখনো বন্দরে হলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার নারায়ণ চন্দ্র দে বলেন, ‘ভারত থেকে হঠাৎ করে আদা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চায়না আদার চাহিদা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সামনে কোরবানি। কোরবানিতে এমনিতেই আদার চাহিদা বেশি থাকে। মূলত চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আদার দাম বাড়ছে। তাছাড়া এক বছর ধরে আমদানিকারকরা লাগাতার লোকসান দিয়েছেন।’
বন্দর থেকে খালাস নেওয়া না হলেও নিজের আমদানিকৃত আদা নেই দাবি করে নারায়ণ চন্দ্র দে বলেন, ‘আমি কয়েকদিন আগেই আদা বিক্রি করে দিয়েছি। তখন কেজি ১২০ টাকা ছিল।’
আরেক আমদানিকারক মো. ইকবাল বলেন, ‘বাজারে ভারতীয় আদা নেই। যে কারণে চায়না আদার চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহ কম, তার পাশাপাশি সামনে কোরবানি। যে কারণে আদার দাম বাড়ছে।’ সামনের সপ্তাহে কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারেন বলে জানান তিনি।
ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজারে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। এ সুযোগ নিচ্ছে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। আদা আমাদের দেশেও উৎপাদন হয়। পাশের দেশ থেকেও আদা আসে। ১৫ দিন আগেও খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ৯৫ টাকা কেজিতে আদা বিক্রি হয়েছে। এমন কী হয়েছে, ১৫ দিনের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেলো। পুরো বিষয়টিতে সিন্ডিকেট কারসাজি চলছে। কয়েকজন আমদানিকারক সিন্ডিকেট করে বন্দর থেকে আদা খালাস নিচ্ছে না। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত বাজারে নজরদারি বাড়ানো।’