শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০২:৪০ পূর্বাহ্ন
Logo

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের কারণ কী, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কোন কোন দেশ

/ ৮৮ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

অনলাইন ডেক্স ।।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বয়ে যাওয়া রেকর্ড গড়া প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ তাপমাত্রাকে বিপজ্জনক উচ্চতায় ঠেলে দিয়েছে। এতে ২০০ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর পরিবেশগত ভঙ্গুরতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা মৌসুমি স্বাভাবিক গড়ের অনেক ওপরে উঠে গেছে। কিছু এলাকায় তা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে বা তা ছাড়িয়ে গেছে।

পাকিস্তানে স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার তাপসংক্রান্ত স্বাস্থ্যগত জটিলতায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও তাপপ্রবাহ–সম্পর্কিত একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এই অঞ্চলের জন্য পুরোপুরি নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মের প্রথম দিকেই তাপপ্রবাহ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানী ও আবহাওয়া সংস্থাগুলো বলছে, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং ভৌগোলিক বিস্তার নজিরবিহীন।

বিশেষজ্ঞরা ক্রমেই এসব চরম আবহাওয়াকে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করছেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরনে চরম বৈচিত্র্য সৃষ্টি করছে। সরকারগুলো যখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই সংকট অঞ্চলজুড়ে গভীর বৈষম্যও উন্মোচন করছে। কে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি বহন করছে, আর কারা এই দুর্যোগ সহ্য করার সক্ষমতা রাখে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বছরের এত শুরুর দিকেই তাপপ্রবাহ কেন?
ভারতে ‘অস্বাভাবিকভাবে আগাম ও তীব্র তাপপ্রবাহ’ দেখা যাচ্ছে বলে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন দেশটির ভরতি ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসি থিংক ট্যাংকের গবেষণা পরিচালক অঞ্জল প্রকাশ। তিনি বলেন, ‘উচ্চচাপ বলয় প্রাধান্য বিস্তার করে গরম বাতাসকে গম্বুজের মতো ভূপৃষ্ঠের কাছে আটকে রাখছে। এতে বাতাস ওপরে উঠতে ও ঠান্ডা হতে পারছে না।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘নিচের দিকে নামা এই বাতাস সংকুচিত হয়, অ্যাডিয়াবেটিক প্রক্রিয়ায় (অ্যাডিয়াবেটিক বা রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়া হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে কোনো সিস্টেমের/স্থানের ভেতর তাপ ঢুকতে পারবে না আবার বেরও হতে পারবে না) আরও উষ্ণ হয় এবং মেঘ তৈরি ঠেকিয়ে দেয়। ফলে সূর্যের তাপ অবিরামভাবে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে।’ তিনি আরও বলেন, জলবায়ু-সম্পর্কিত কয়েকটি কারণও এই তাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তাঁর ভাষ্য, ‘দুর্বল প্রাক্‌-মৌসুমি বৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী এল নিনো-সদৃশ পরিস্থিতি শীতল হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে।’

নাসার তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ‘স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ’ হয়ে উঠলে এল নিনো তৈরি হয়। এর সঙ্গে আমেরিকা থেকে এশিয়ার দিকে প্রবাহিত পূবালী বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। বিপরীতে, লা নিনা জলবায়ু পরিস্থিতি সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রায় সামান্য শীতল প্রভাব ফেলে।

জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ডব্লিউএমওর প্রধান উইলফ্রান মুফৌমা-ওকিয়া গত মাসে সতর্ক করে বলেন, ‘বছরের শুরুতে নিরপেক্ষ পরিস্থিতি থাকার পর এখন এল নিনোর সূচনার বিষয়ে উচ্চমাত্রার নিশ্চিততা রয়েছে, এবং এরপর তা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ ডব্লিউএমও আরও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর ঘনঘটা বা তীব্রতা বাড়াচ্ছে, এমন প্রমাণ নেই। তবে এটি এল নিনোর প্রভাবকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
ভারত

ইন্ডিয়া মেটিওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি) জানিয়েছে, দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, পশ্চিমাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় এ মাসে তীব্র তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি দেখা দেবে। আইএমডি বলেছে, পূর্ব উপকূলজুড়ে, হিমালয়ের পাদদেশের কিছু অংশে এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপপ্রবাহ দেখা যেতে পারে।

আইএমডির প্রধান মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেন, ‘মে মাসে পূর্ব উপকূলীয় রাজ্যগুলো ও গুজরাটে স্বাভাবিকের তুলনায় চার থেকে পাঁচ দিন বেশি তাপপ্রবাহ থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। মহারাষ্ট্রে ২৬ এপ্রিল আকোলা ও অমরাবতী শহরে যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৯ এবং ৪৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২৪ এপ্রিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৯০টিরও বেশি শহর ভারতের ছিল। চরম তাপপ্রবাহ শুরুর পর থেকে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দুই স্কুলশিক্ষক হিটস্ট্রোকে মারা যান। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তাপের কারণে আরও চারজনের মৃত্যুর খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে।

পাকিস্তান

ভারতের পশ্চিম প্রতিবেশী পাকিস্তানও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। শনিবার পাকিস্তান মেটিওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (পিএমডি) সিন্ধ প্রদেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দেয়। সংস্থাটি নাগরিকদের দিনের বেলায় সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে।

দেশটির সবচেয়ে জনবহুল শহর করাচিতে চলতি সপ্তাহের সোমবার তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। পিএমডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর এটিই শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভয়াবহ তাপপ্রবাহে শহরটিতে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিন্ধু প্রদেশের জ্যাকবাবাদ ও শুক্কুর শহরে এ সপ্তাহের শেষ দিকে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, পাশাপাশি ফরিদপুর, রাজশাহী ও পাবনা জেলা এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগ পর্যন্ত তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব এলাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৮.৬ ফারেনহাইট) থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০০.৪ ফারেনহাইট) পর্যন্ত।

বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেশ কিছুদিন ধরেই বাড়ছে। ২০২৪ সালে কর্তৃপক্ষ জানায়, এপ্রিল মাসে দেশে ২৪টি তাপপ্রবাহের দিন রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিছু জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যায়। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০১৯ সালে, যখন ২৩ দিন তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল।

এই তাপপ্রবাহ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলছে
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মিত্তাল সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো কার্তিকিয়া ভাতোতিয়া বলেন, চরম তাপদাহ মানুষের ওপর ‘বহুমাত্রিক পথে’ প্রভাব ফেলে, তবে এর প্রভাব গভীরভাবে বৈষম্যমূলক। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতি হয় শারীরবৃত্তীয়ভাবে। অতিরিক্ত তাপ শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে ভেঙে দেয়। এতে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঘুম ব্যাহত হয় এবং ডায়াবেটিস, শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ আরও খারাপ হয়। বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী, ছোট শিশু এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।’

তিনি বলেন, সমস্যাটির একটি বড় অংশ ‘কাঠামোগত’। নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষেরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তিনি বলেন, ‘যারা অপর্যাপ্ত নিরোধক ও দুর্বল বায়ু চলাচলযুক্ত ঘরে বসবাস করেন, তারা শীতল পরিবেশে থাকার সুযোগ পাওয়া মানুষের তুলনায় বেশি তাপচাপে ভোগেন। আর তারাই আবার খোলা আকাশের নিচে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য হন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে প্রায় ৩৮ কোটি মানুষ, অর্থাৎ শ্রমশক্তির প্রায় চারভাগের তিনভাগ, এমন কাজে নিয়োজিত যা সরাসরি তাপের মধ্যে করতে হয়। কাজের সময় কমে যাওয়ায় দৈনিক মজুরি ও খণ্ডকালীন আয়ে ধস নামে। এর প্রভাব পরে পুষ্টি ও ওষুধ কেনার সক্ষমতার ওপরও পড়ে। কিন্তু এসব ক্ষতিকে সচরাচর সরাসরি তাপপ্রবাহজনিত ক্ষতি হিসেবে গণনা করা হয় না।’

ভবিষ্যতে কি তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ হবে?
হ্যাঁ।

হার্ভার্ডের ভাতোতিয়া বলেন, ‘জলবায়ু মডেলগুলো দেখাচ্ছে, মাঝারি মাত্রার নির্গমন পরিস্থিতিতেও আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা দুটোই বাড়বে।’ তিনি বলেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভারত বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ধীরগতিতে উষ্ণ হয়েছে। তবে এর পেছনে আংশিক কারণ হলো অ্যারোসল দূষণের সাময়িক শীতল প্রভাব এবং ব্যাপক সেচব্যবস্থা।

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আগামী বছরগুলোতে এই দুই প্রভাবই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে অতীতের তথ্য যা ইঙ্গিত দেয়, বাস্তবে তার চেয়েও দ্রুত উষ্ণতা বাড়তে পারে।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাপমাত্রা বাড়লেই যে মানুষের দুর্ভোগ একই হারে বাড়বে, এমন নয়। তবে সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাঁর মতে, ‘ভালো অভিযোজন পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ এবং পূর্বানুমোদিত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে, এমনকি তাপমাত্রা বাড়লেও।’ তাঁর ভাষায়, ‘লক্ষ্য হওয়া উচিত তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাকে মানুষের কষ্ট বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে আলাদা করে ফেলা।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com