বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫০ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ :
ব্যাবসায়ী নাসিরের মামলা: পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আগামী বছরও ঈদুল ফিতরে ৫, আজহায় ৬ ও পূজায় ২ দিন ছুটি যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূর হাত-পায়ের রগ কর্তন, প্রধান আসামি গ্রেফতার নিষেধাজ্ঞা শেষে ধরা পড়া ৯৫ শতাংশই ডিমওয়ালা ইলিশ ১৭ বছরেও পাননি বাবার সম্পদ, ৭ হাজার ৪৬১ কোটির দাবিতে গেলেন আদালতে ঝাড়ফুঁকের নামে কিশোরীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক, ব্ল্যাকমেলের অভিযোগে কবিরাজ গ্রেপ্তার এইচএসসির অকৃতকার্যদের পরীক্ষা শুরু ১ ডিসেম্বর ভোলা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তৈয়বুর রহমান ওএসডি হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক মেহেন্দিগঞ্জে খালের ওপর কোচিং সেন্টার, পাটাতন ভেঙে আহত ৩০ শিক্ষার্থী

নিষেধাজ্ঞা শেষে ধরা পড়া ৯৫ শতাংশই ডিমওয়ালা ইলিশ

/ ২১ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

নিষেধাজ্ঞা শেষে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। কিন্তু জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ। যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশিরভাগের পেটেই ডিম। জেলেদের হিসাবে, ১০০টি ইলিশের মধ্যে ৯৫টিতেই ডিম পাওয়া যাচ্ছে। কিছু মাছের ডিম ছাড়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্তু জালে ধরা পড়ায় সেগুলো ডিম ছাড়তে পারেনি।

জেলে ও মৎস্য আড়তদারদের অভিযোগ, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সঠিক সময়ে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের ধারণা, নিষেধাজ্ঞার সময় আরও পরে নির্ধারণ করা হলে অধিকাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেত।

অন্যদিকে মৎস্যবিজ্ঞানীর মতে, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ইলিশের প্রজনন মৌসুমে পরিবর্তন আসতে পারে। যথাযথভাবে ডিম ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে ইলিশের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জালে ইলিশ কম, বেশিরভাগের পেটে ডিম

ভোলার বিভিন্ন মৎস্য ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে দল বেঁধে নেমেছেন জেলেরা। জেলায় প্রায় তিন লাখ জেলে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত। নিষেধাজ্ঞা শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশা থাকলেও নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ মিলছে না। আবার যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশিরভাগই ডিমওয়ালা।

ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে সুজন মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রতিদিন পাঁচজন মাঝি মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে যাচ্ছেন। ভোর ও বিকেলে মাছ ধরে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ইলিশ পাচ্ছেন তারা। এর মধ্যে কোনো দিন এক-দুটি মাছ ডিম ছাড়া পাওয়া গেলেও বাকিগুলোর পেট ডিমে ভরা থাকে। কিছু ইলিশের ডিম ছাড়তে এক-দুই দিন বাকি ছিল বলেও জানান তিনি।

সুজন মাঝি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরও পরে দেওয়া ঠিক হতো। চলতি নভেম্বর মাসে অভিযান দিলে আমার মনে হয়, সবগুলো মাছই ডিম ছাড়তে পারত। ডিম ছাড়তে পারলে নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়ত।

রাজাপুর ইউনিয়নের জনতা বাজার এলাকার জেলে জহির মাঝি জানান, সাতজন মাঝি একটি ট্রলারে করে প্রতিদিন ভোর ও বিকেলে নদীতে যাচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞার পর কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ পাওয়ার আশা করলেও তা হচ্ছে না। তবে যে কয়টি মাছ পাওয়া যাচ্ছে, প্রায় সবগুলোর পেটেই ডিম রয়েছে। কয়েকটি মাছের ডিম কিছুটা ছাড়া অবস্থায় জালে উঠেছে।

একই ইউনিয়নের আরেক জেলে কালাম মাঝি জানান, আটজন মিলে নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরা শুরু করেছেন। গত ১ নভেম্বর বিকেল পর্যন্ত তারা বিভিন্ন আকারের সাড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০টি ইলিশ পেয়েছেন। এর বেশিরভাগই ছোট আকারের। বড় মাছ ছিল অল্প কয়েকটি। সব মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫টি ডিম ছাড়া ইলিশ পেয়েছেন তারা। কিছু পুরুষ ইলিশও ছিল। বাকি মাছগুলোর পেটে ডিম ছিল।

ডিমওয়ালা ইলিশ এত বেশি আগে দেখেননি জেলেরা

ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকার জেলে জামাল মাঝি ও ভোলার শিবপুরের খাল এলাকার জেলে ভূট্ট মাঝি জানান, বহু বছর ধরে তারা মাছ ধরার পেশায় রয়েছেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে এ বছর যত বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ পেয়েছেন, অন্য কোনো বছর এমনটি দেখেননি। আগের বছরগুলোতে জালে ডিম ছাড়া ইলিশের সংখ্যাই বেশি থাকত। ডিমওয়ালা মাছ পাওয়া যেত তুলনামূলক কম।

তাদের ধারণা, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে দেওয়া হলে ইলিশের ডিম ছাড়ার সুযোগ বেশি থাকত। তারা বলেন, আমরা ডিমওয়ালা ইলিশ শিকার করতে চাই না। জালে এমন মাছ উঠলে আমাদেরও খারাপ লাগে। এই ইলিশ ডিম ছাড়লে ভবিষ্যতে আমরাই বড় ইলিশ ধরতে পারব।

ভেদুরিয়া ইউনিয়নের জেলে মো. হানিফ মাঝি ও ফরিদ মাঝিও ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন তারা অনেক কষ্ট করে নদীতে যাননি। এরপরও যদি ইলিশ ঠিকমতো ডিম ছাড়তে না পারে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জেলেরা। ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে ইলিশের পরিমাণ কমে গেলে মাছ ধরে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

আড়তেও ডিমওয়ালা ইলিশের আধিক্য

পূর্ব ইলিশ মৎস্য ঘাটের আড়তদার মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজী জানান, প্রজনন মৌসুমের আগে প্রতিবছরই মৎস্য বিভাগকে নিষেধাজ্ঞার সময় সঠিকভাবে নির্ধারণের অনুরোধ করেন তারা। এবারও একই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা ঘাটে যে ইলিশ নিয়ে আসছেন, তার বেশিরভাগই ডিমওয়ালা।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ঘাটে জেলেরা ইলিশ নিয়ে আসছেন। আমরা নিলামের মাধ্যমে হাজার হাজার ইলিশ বিক্রি করছি। তবে এবার সবচেয়ে বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ দেখা যাচ্ছে। ডিম ছাড়া ইলিশের পরিমাণ খুবই কম। গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকেরও কম ইলিশ ডিম ছেড়েছে বলে আমার অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে।

সাহাবুদ্দিন ফরাজীর মতে, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ সঠিক হয়নি। তার ধারণা, নভেম্বরের ১ তারিখ বা প্রথম সপ্তাহ থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত। এ কারণে আগামী বছর নিষেধাজ্ঞার তারিখ নির্ধারণে ভোলার জেলে ও মৎস্যজীবীদের মতামত গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

তার আশঙ্কা, এ বছর ইলিশ ঠিকমতো ডিম ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে মাছের সংকট দেখা দিতে পারে।

পাঁচ বছরে ইলিশ উৎপাদনের চিত্র
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে জেলায় ইলিশ উৎপাদন ওঠানামা করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টনে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন হলেও পরের বছর বেড়ে হয় ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩১ মেট্রিক টন।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলায় ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩১ মেট্রিক টনে।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসাইন জানান, ইলিশ সারা বছরই ডিম ছাড়ে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে বেশি ডিম ছাড়ে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও এখনো কিছু ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় রয়েছে। কিছু ইলিশ ডিম ছাড়বে, আবার কিছু মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়বে।

তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞার সময় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নির্ধারণ করেছে। আমরা তাদের প্রস্তাবনা দিই। নিষেধাজ্ঞার সময় সঠিক হয়েছে কি না, তা আমি জানি না।

পর্যাপ্ত ইলিশ ডিম ছাড়তে না পারলে নদী ও সাগরে মাছের সংকট দেখা দিতে পারে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, জ্যেষ্ঠ মৎস্যবিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ইলিশের পেটে ডিম ছিল। অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় ইলিশ ঠিকমতো ডিম ছাড়তে পেরেছে বলে তার মনে হয় না।

তিনি বলেন, এটি আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হতে পারে। ধারণা করা যাচ্ছে, আগের তুলনায় প্রজনন মৌসুমে ব্যতিক্রম ঘটছে। এতে আগামীতে নদী ও সাগরে ইলিশের কিছুটা সংকট দেখা দিতে পারে।

তবে এই সংকট এড়াতে জাটকা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, জাটকা নিধনকারী অবৈধ জালের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com