নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
রুপালি ইলিশের মৌসুম শুরু হলো ১ জুন থেকে। তবে নদ-নদীতে ধরা পড়ছে না ইলিশ। এদিকে বাজারে ইলিশের দাম আকাশচুম্বি। এমন সংকটের মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে অভয়াশ্রমে বেড়ে ওঠা জাটকা। ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছর অভয়াশ্রমের জাটকার প্রায় ৯০ শতাংশ সাগরে পৌঁছেছে। মৌসুমের শেষ দিকে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ এর সুফল পাওয়া যেতে পারে।
নদীতে ইলিশ ধরা পড়ছে কি না, এ নিয়ে কথা হয় বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউপির টুমচরের বাসিন্দা সালামের সঙ্গে। তিনি মাছ ধরেন কালাবদর নদীতে। সালাম বলেন, ইলিশ নেই, জাটকাও নেই। তাঁর ধারণা, বৃষ্টি হলে মাছ ধরা পড়বে।
এ নিয়ে চরমনোইর কীর্তনখোলাসংলগ্ন জেলে আজমল হোসেন বলেন, ‘এ বছর দেনা মুক্ত হতে হলে মাছ পেতে হবে। তাই আগেভাগে নদীতে নেমেছেন। অবৈধ কারেন্ট জাল, পাই জাল বন্ধ করতে পারলে ইলিশ মিলবে।’
নদীতে মাছ না থাকার কারণ জানতে চাইলে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেছেন, এবার এপ্রিলের শেষ নাগাদ ঝাঁকে ঝাঁকে চাপিলা আকৃতির জাটকা (ছোট ইলিশ) সাগরে চলে গেছে। গত বছরের জাটকার ঝাঁক সাগরে গিয়েছিল মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। তাঁর মতে, এই চাপিলা আকৃতির জাটকা স্রোতের বিপরীতে এক হয়ে ‘ফিশ স্কুল’ হিসেবে জড়ো হয়। মেহেন্দীগঞ্জের বাগরজার মালদ্বীপের চরে এবারও এই জাটকা দলবদ্ধ হয়ে জড়ো হয়েছিল। এবারের ভালো দিক হলো, মৎস্য অধিদপ্তরের নজরদারিতে পাই জাল দিয়ে চাপিলা সাইজের জাটকা ধরতে পারেনি বেশি। নদীতে এগুলো ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি হয়ে সাগরে পৌঁছেছে।
নাসির উদ্দিন আরও বলেন, গত বছরের তুলনায় ৯০ শতাংশ জাটকা সাগরে চলে গেছে বলে তাদের ধারণা। এখন দরকার সাগরে এটিকে বড় হতে দেওয়া।
এবারের ইলিশের পরিস্থিতি নিয়ে গবেষকেরা বলছেন, যে জাটকাগুলো সাগরে পৌঁছাতে পেরেছে, সেগুলো বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার। যদিও ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। তবে সময়সীমা আরেকটু বাড়লে এই জাটকা বড় হতে পারবে। তবে এ নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে গবেষকদের। তাঁরা বলছেন, সাগর থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ নদীতে আসবে ডিম ছাড়তে। আশঙ্কার বিষয় হলো, দুই বছর ধরে ছোট আকারের ইলিশ (৩০০-৫০০ গ্রাম) ডিম ছাড়তে নদীতে আসে। আর নদীতে এলেই সেগুলো ধরা পড়ছে। জাটকাগুলো এক কেজির ইলিশ হিসেবে পেতে প্রায় দুই বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে ইলিশের দাম নিয়ে পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় নদীতে ইলিশ একদম কম। গত রোববার মোকামে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ ইলিশ এসেছে। অথচ এই সময়ে দুই থেকে তিন শ মণ ইলিশ পাওয়ার কথা। তিনি জানান, সেদিন এক কেজি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার টাকা, ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের (এলসি) ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চাপালি আকৃতির ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছের সংকট বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোর্ট রোড মোকামে গত রোববার সকালে ১ কেজি ৪০০ গ্রামের একটি ইলিশ ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনলেন ব্যবসায়ী মোতালেব মিয়া। তিনি জানান, ঈদে মেহমানদের জন্য কিনেছেন মাছটি।
মৌসুম শুরু হলেও ইলিশের খরা প্রসঙ্গে বরিশাল মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও ভরা মৌসুম জুলাই থেকে শুরু হয়। বৃষ্টি হলেই সাগর থেকে নদীতে ইলিশ আসবে বলে তিনি আশা করেন। কারণ এ বছর মার্চ থেকে এপ্রিল এই দুই মাস ষষ্ঠ অভয়াশ্রমে কড়া নজর থাকায় জাটকা নিধন কমেছে। জাটকা রক্ষায় নদীতে ৩০ জুন পর্যন্ত এবং সাগরে ১১ জুন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা চলমান রয়েছে। তবে ইলিশ ধরায় এখন বাধা নেই।