নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
দুইশ’র অধীক পেটে-ভাতের কর্মীদের শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়ায় চক্রান্তের জালে আটকে যাচ্ছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাক্তার এ কে এম মশিউল মুনির।
পেটে-ভাতের এ সকল কর্মীরাই দালাল হিসেবে কাজ করে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। আর এদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এসব দালালদের নিয়োগ দেন তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির শতাধিক কর্মচারী এবং ওয়ার্ড মাস্টার ও কিছু সংখ্যক নার্স। এজন্য যারা নিয়োগ দেন তাদের দাদন (অগ্রিম টাকা) থেকে শুরু করে প্রতিমাসে মাসিক মাসোয়ারা পর্যন্ত গুনতে হয় পেটে-ভাতের কর্মীদের।
আর পেটে-ভাতের ঐ সকল কর্মীরা নিয়োগ পেয়ে হাসপাতালে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পেশা। এমনকি যারা তাদের নিয়োগ দেন ওই সকল কর্মচারীরা কোন কাজ না করে বেতন ভাতা তোলেন। একই সাথে মাসিক মাসোয়ারা এবং দাদন তো রয়েছেই তাদের।
দীর্ঘবছর পর প্রথমবারের মতো ঐ সকল পেটে-ভাতের কর্মীদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন তাদের নিয়োগ দাতারা। তারা তাদের ফিরিয়ে আনতে এখন কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর মালিক, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের নিয়ে পরিচালকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতেছেন এ কাজের সাথে জড়িত সিন্ডিকেট সদস্যরা।
এখন বের করে দেওয়া ওই সকল দালালদের আবারো হাসপাতালে কাজ করতে দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে পরিচালকের উপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বের করে দেওয়া পেটে-ভাতের কর্মী বেল্লাল ও সুমিতা বলেন, তারা হাসপাতালে কাজ করার জন্য তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। একই সাথে রোগীদের কাছ থেকে যে টাকা আয় হবে তার একটা অংশ মাসে তাকে দিতে হবে। তাদের বের করে দেওয়ায় তারা কাজ হারিয়ে এখন সমস্যায় পড়েছেন। অথচ যে সময় দাদন দেওয়া হয়েছিল সে নিশ্চিত করেছিল তাদের কোন সমস্যা নেই তারা প্রতিদিন কাজ করতে পারবেন এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকাও আয় করতে পারবেন।
তারা আরো জানান, প্রতিদিন রোগীদের বিভিন্ন কাজ করে দেয়ার জন্য তারা কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতে পারতেন। মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা তাদের আয় হয়। এ ছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠালে তারও পার্সেনটেজ পেতেন। একই পরিবারের দুজন এ কাজে থাকতে পারলে আয় আরো বেশি হয় বলে জানান তারা।
তারা বলেন, এ জন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অথবা রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সুপারিশ করিয়ে তারপর তাদের হাসপাতালে কাজ মেলে। তবে এসব বিষয় পরিচালক অথবা সহকারী পরিচালক তারা কিছুই জানেন না বলে অকপটে জানান পেটে-ভাতের কর্মীরা।
আরো দুই কর্মী বলেন, এখানে কাজ করলে হাসপাতালের খাবার থেকে শুরু করে ঔষধ এবং আত্মীয়-স্বজনের চিকিৎসা, নিজেদের চিকিৎসা সবই ফ্রিতে করার সুযোগ মেলে। অনেক চিকিৎসক তাদের চেনেন না, তারা জানেন তারা বেতনভুক্ত কর্মচারী। আর এটা নিশ্চিত করে তারা যার মাধ্যমে সেখানে প্রবেশ করেন। তারাই বিভিন্ন ওয়ার্ডে তাদেরকে কাজ করার সুযোগ করে দেন। ওয়ার্ড মাস্টার, সিনিয়র নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের নেতা তাদের পক্ষে থাকায় বছরের পর বছর কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। প্রথমবারের মতো পেটে-ভাতের কর্মীদের খুঁজে খুঁজে বের করে দেয়া হয়েছে। তাদের মতে ২০০ এর অধীক কর্মরত ছিল বিভিন্ন ওয়ার্ডে। এছাড়া আরো অনেকের টাকা দেওয়া আছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের নিকট। এ সমস্যায় পড়ার পর ওই সকল লোকজন যারা দাদন দিয়েছিলেন তারা টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। পরিচালকের বিদায় ঘন্টা বাজলে সকলকে আবারো কাজ দেওয়া হবে বলে ওই সকল তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা বুঝিয়ে রাখছেন।
হাসপাতাল সংশ্লিস্টরা বলেন, পেটে-ভাতে যারা কাজ করছিলেন তারা রোগীদের বিভিন্ন জিনিস চুরি থেকে শুরু করে হাসপাতালে ঔষধ খাবার বেডকভার এমন কিছু নেই যা তাদের হাত থেকে বাঁচত। সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হতো রোগীদের। জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন তারা। এমনকি নবজাতক হলে রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। রোগীরা কোনভাবেই বুঝতেন না এরা হাসপাতালের নিয়মিত কর্মচারী নয়। এদের সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী তাদের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারত না। বিভিন্ন সময় চোরাই মালামাল সহ তারা আটক হলেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যেতেন। তাদের বের করে দেওয়ায় সকলে খুশি হয়েছেন বলে জানান তারা।
প্রশাসনিক দপ্তর সূত্র থেকে জানা গেছে, চারশ’র অধিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের কাছে ইতিপূর্বে যারাই পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা অসহায় ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে গেলে কর্মবিরতির ডাক সহ হাসপাতালে নৈরাজ্য সৃষ্টি করায় এ ধরনের পদক্ষেপ কোন পরিচালক গ্রহণ করতে পারেননি।
এমনকি পরিচালকের হস্তক্ষেপে র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযানে কিছু দালাল ধরা পড়লেও তা আবার আদালত থেকে বের হয়ে একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আবদুল মুনায়েম সাদ বলেন, “এই অনিবন্ধিত (পেটে-ভাতের) কর্মীরা কীভাবে বছরের পর বছর হাসপাতালে কাজ করেছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা জেনেছি, হাসপাতাল ৫০০ থেকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকেই তারা বিভিন্নভাবে এখানে কাজ করে আসছিল। কিন্তু কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের ব্যবস্থা অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, “শুধু পেটের দায়ে কাজ করছে এমন যুক্তি দিয়ে বছরের পর বছর একটি অনিয়মিত ব্যবস্থা চলতে পারে না। আমরা এই ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চাই। যে কারণে অনেক চাপও সৃষ্টি হচ্ছে। এ চাপ মোকাবিলা করতে হলে বরিশালবাসী তথা গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাঃ মশিউল মুনীর বলেন, ৫০০ শয্যার লোকবল নিয়ে সাজানো ব্যবস্থাপনায় চলছে ১০০০ শয্যার হাসপাতাল। যে কারণে অনিয়ম ও দুর্নীতি এখানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নতুন কোনো বন্দোবস্ত অনেকেই নিতে পারছেনা। পরিবর্তন করতে চাইলেই বিভিন্ন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ প্রশাসনিক, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি করছে।
পরিচালক বলেন, আমাদের এই হাসপাতালের সেবার মান উন্নিত করতে হলে প্রথম এবং প্রধান কাজ এখন ১০০০ শয্যাও নয়, এখন আমাদের ২৫০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা তৈরি ও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ, দিনকে দিন রোগীর চাপ বাড়ছে এবং ভর্তি রোগীর সংখ্যা গড়ে তিন হাজারের উপরে বলে জানান পরিচালক।