Loading Now

এক মাসে ১১ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা মিলছে?

অনলাইন ডেক্স ।।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে দেশের আওহাওয়া অফিস বলছে, চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ১১ বার কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের ভূমি। এগুলোর বেশিভাগ উৎপত্তি আশপাশ অঞ্চলে হলেও অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ আজ শুক্রবারও (২৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূকম্পন অনুভূত হয়। এদিন দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি দেশের ভেতরে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৩। বিগত কয়েক মাসে দেশের ভেতরে আরও বেশ কিছু ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়েছে। দেশের আশপাশেও প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প হচ্ছে। যারফলে একধরণের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে জনমনে। বিশেষজ্ঞদেরও আশঙ্কা, এই অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঘন ঘন ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে সেই ঝুঁকির ‘বার্তা প্রকাশ’ করছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক ভূমিকম্প হয়। তবে এগুলোর অনেকগুলোই আমরা টের পাই না বা অনুভব হয় না। তবে এই ছোট কম্পনগুলো একেকটা বড় ভূমিকম্পের বার্তা।’

 

এই ভূতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘মূলত যেখানে একবার ভূমিকম্প হয়, সেখানেই আবার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কারণ সেখানে শক্তি জমা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়, এই বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহিৃত করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সিলেট অঞ্চল থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার তথা  চট্রগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে অতীতে বড়মাত্রা ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। এই অঞ্চলের মাটির নীচে যে পরিমাণ শক্তি জমায়িত রয়েছে তাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। এটি যখন তখনই ঘটতে পারে।’

চলতি মাসে যত ভূকম্পন

চলতি মাসের শুরুদিনই দুই বারবার ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথমটি ওইদিন ভোর ৪ টা ৩২ মিনিটি ৩২ সেকেন্ডে ঘটেছিল। সেটি ঢাকা থেকে ২০৮ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তি হয়েছিল, এটি সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বের এলাকায় উৎপত্তি হয়েছিল। রিখটার স্কেলে যারমাত্রা ছিল ৩.০। আবার একইদিন সন্ধ্যায় ৬টা ৩০ মিনিটি ২৬ সেকেন্টে আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এটি ঢাকা থেকে মাত্র ৪২ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তি হয়েছিল। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩.২।

এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি এসে আবার দুই দফায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে দেশ। ওইদিন রাত ৯ টা ৩৪ মিনিটি ০১ সেকেন্ডে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে ৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। যা ঢাকা থেকে ৫২১ কিলোমিটারে দূরে ছিল। তবে মাঝারি ধরণেই ওই ভূমিকম্প চট্রগ্রাম অঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। তবে একই দিন আরেকটি ভূমিকম্প হলেও সেটি ছিল ৪.১ মাত্রার। স্বল্পমাত্রার ওই ভূমিকম্পটি উৎপত্তি হয়েছিল ঢাকা থেকে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে।

 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডাটা অনুযায়ী, পরবর্তিতে ৯ ফেব্রয়ারি (৩.৩ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২২১ কিলোমিটার দূরে), ১০ ফেব্রুয়ারি (৪.০ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২১৪ কিলোমিটার দূরে), ১৯ ফেব্রুয়ারি (৪.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১৮৭ কিলোমিটার দূরে), ২০ ফেব্রুয়ারি (৩.৬ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১২৮ কিলোমিটার দূরে), ২৩ ফেব্রুয়ারি (৪.৪ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২৫২ কিলোমিটার দূরে) ও ২৫ ফেব্রুয়ারি (৫.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ৪৬২ কিলোমিটার দূরে) বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছিল।

গত জানুয়ারিতেও ভূমিকম্পে কয়েকবার কেঁপেছে দেশ। এরআগে ডিসেম্বরেও ভূমিকম্প হয়েছে। বিশেষ করে গত নভেম্বরে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর ঘোড়াশালে এক সপ্তাহে চার দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়ছিল। এরমধ্যে গত ২১ নভেম্বর সকাল ১০ টা ৩৮ মিনিটে ঘোড়াশাল এলাকায় ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার কেন্দ্রস্থল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিমি গভীরে ছিল।

ওই ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপকভাবে কম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূকম্পনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়ে। অনেক ভবনে ফাটল দেখা দেয়। কয়েকজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন আহত হন।

বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা

তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ। এরমধ্যে কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে মেঘনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে আন্দামানের পাশ দিয়ে দক্ষিণে যদি একটা রেখা কল্পনা করা হয়, তবে এই এলাকাটা হচ্ছে দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল। আর এই দুটি প্লেটের মধ্যে পূর্ব দিকেরটা হচ্ছে বার্মা প্লেট। আর পশ্চিমেরটা হচ্ছে ইন্ডিয়া প্লেট। এই সংযোগস্থলের উপরের ভাগটা অর্থাৎ সুনামগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে পূর্বে মনিপুর, মিজোরাম পর্যন্ত- এই অঞ্চলটি ‘লকড’ হয়ে গেছে অর্থাৎ এখানে শক্তি জমা হয়ে আছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, ‘এই অঞ্চলে অতীতে অনেক বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়া ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছে, যেটি ছিল ৮.৫ মাত্রার। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে বিরাট ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৭৬২ সনে আমাদের টেকনাফ আইল্যান্ডের দক্ষিণপাশে একটি ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছিল, যারফলে টেকনাফ আইল্যান্ড কয়েকমিটার পর্যন্ত উচু হয়ে গিয়েছিল এক নিমিষে।’

 

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের ফলে সীতাকুণ্ডে পাহারের উপরে ভলকানো উদগীরণ হয়েছিল, তখন পতেঙ্গায় নোঙ্গর করা জাহাজ থেকে সেটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন পর্তুগিজ নাবিকরা। ওই সময় ইন্ডিয়ান গেজেটে এগুলো প্রকাশিত হয়। এখানে অসংখ্যা প্রমাণ আছে বড় ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হচ্ছে- আমাদের আশেপাশে বিগত ১০০ বছরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। তার অর্থ হলো- এই সময়টা জুড়ে যে শক্তি সঞ্চিয়িত হয়ে আছে সেটি যেকোন সময় রিলিজ করবে। এবং এটা আমাদের ভয়াবহ একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।’

প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ

ভূমিকম্পের প্রস্তুতি সম্পর্কে এই ঢাবি অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের ভূমিকম্প সংঘঠিত হওয়ার পূর্বে ও পরে এবং ভূমিকম্প সংঘঠিত হওয়ার সময়ের প্রস্তুতি অনির্বায্যভাবে আমাদের নিতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে আবশ্যিকভাবে ভূমিকম্পের বিষয় অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারণ আমরা এমন একটি জায়গায় বসবাস করি যেখানে ভূমিকম্প ঘটবেই।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৌশল বিদ্যার একেবারে সর্বোচ্চ ব্যবহার বিধি মেনে এগুলো পুননির্মান করতে হবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে আমরা গরিব দেশ। তাহলে প্রতিদিন যে উইপোকার মতো হাজার হাজার বিল্ডিং হচ্ছে। ২০ তলা। ১৫ তলা। ১৭ তলা-এগুলো কী মাগনা হচ্ছে? এখানে টাকা নেই?

আমি প্রতিনিয়ত বিল্ডিং তৈরি করছি উইপোকার ডিবির মতো। এবং বিল্ডিং কোর্ড না মেনেই করছি। আমি দশ কোটি টাকা দিয়ে একটা ইমরারত তৈরি করলাম। আর ১১ কোটি দিয়ে যদি একটা ভূমিকম্প সহায়ক করি তাহলে আমার কী ক্ষতি হলো? এটা বাধ্য করতে হবে মানুষকে। সচেতনা তৈরি করতে হবে প্রতিটি পরিবারের ভেতর থেকে।’

‘আমি একটা উদাহরণ দেই। উড়ির চরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে লাখ লাখ মানুষ মারা যান। স্বাধীনতার পূর্বে আমাদের ভোলায় জলোচ্ছাসে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৯২ সালে কক্সবাজারসহ চট্রগ্রাম অঞ্চলে জলোচ্ছাস হয়েছিল, লক্ষাধিক মানুষ এতে মারা গিয়েছিল। এরচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হলো আইলা, সিডর- কিন্তু সে তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি তো কমে আসছে। কেন? কারণ গণসচেতনতা। সাইক্লোন সেন্টার তৈরি। মানুষ ওই সময় কি করবে, পূর্বে কি করবে এবং পরে কি করবে তার প্রস্তুতি। এগুলোর কারণেই তো ক্ষয়ক্ষতি কমেছে।’

তথ্য সূত্র : ঢাকা মেইল,,,,

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED