Loading Now

জলাতঙ্ক: আতঙ্ক নয় সচেতনতাই বাঁচার পথ

অনলাইন ডেক্স ।।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে র‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা এবং উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড় কিংবা আঁচড়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং কিছু মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিন্তু কেন হঠাৎ এই তোলপাড়? আর কেনই-বা বাড়ছে এই রোগের ঝুঁকি?

র‍্যাবিস কেন বাড়ছে
দেশে র‍্যাবিস নিয়ে আলোচনার মূল কারণ কয়েকটি। প্রথমত, শহর ও গ্রামাঞ্চলে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক এলাকায় কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। দ্বিতীয়ত বিড়াল, শিয়াল বা বেজির মতো বন্য প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে বেশি নজরে আসছে। তবে সচেতনতার অভাব এর বড় কারণ। অনেকে এখনো মনে করেন, সামান্য আঁচড়ে কিছু হয় না, যা প্রাণঘাতী ভুল।

উৎস
মূলত সংক্রমিত প্রাণীর লালা। সংক্রমিত পাগল কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজি বা বাদুড়ের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকে। যদি প্রাণীর লালা মানুষের শরীরের কোনো কাটা জায়গা বা মিউকাস মেমব্রেনের (চোখ-মুখ) সংস্পর্শে আসে, তবে সেখান থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।

লক্ষণ
র‍্যাবিস হলে মানুষের মধ্যে সাধারণত দুই ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়—

উত্তেজনাপূর্ণ র‍্যাবিস: রোগী অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে, পানি দেখলে আতঙ্কিত হয়, বাতাস সহ্য করতে পারে না এবং অস্বাভাবিক আচরণ করে।

প্যারালাইটিক র‍্যাবিস: এতে রোগী ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং কোমায় চলে যায়।

ভাইরাস কত দিন লুকিয়ে থাকে
র‍্যাবিস ভাইরাসের একটি অদ্ভুত রকম বৈশিষ্ট্য হলো, এর সুপ্তিকাল। কামড়ানোর পর সাধারণত ১ থেকে ৩ মাস পর লক্ষণ দেখা দেয়। তবে এটি কামড়ের স্থানের ওপর নির্ভর করে এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। মস্তিষ্ক থেকে কামড়ের স্থান যত দূরে হবে, লক্ষণ প্রকাশ পেতে তত দেরি হবে।

ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা
মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের আগে র‍্যাবিস শনাক্ত করার কোনো সহজ পরীক্ষা নেই। সাধারণত ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখেই রোগনির্ণয় করা হয়। মনে রাখা জরুরি, একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে র‍্যাবিস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। এর কোনো কার্যকর প্রতিকার অথবা চিকিৎসা আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই।

প্রতিরোধ ও টিকার গাইডলাইন
কামড় বা আঁচড়ের পরপরই সঠিক ব্যবস্থা নিলে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। তাৎক্ষণিক করণীয় বা প্রাথমিক চিকিৎসা।

এ জন্য যা করতে হবে:

ক্ষতস্থান সাবান দিয়ে ধুয়ে নেওয়া
কামড় বা আঁচড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থানটি কাপড় কাচা সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এতে ভাইরাসটি অনেকাংশে ধুয়েমুছে যায়।

টিকা
দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এখন আমাদের দেশে আধুনিক সেল কালচার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।

কখন ভ্যাকসিন নেবেন: কামড় বা আঁচড় লাগার সঙ্গে সঙ্গে।

ক্ষত গভীর হলে ভ্যাকসিন ও আরআইজি ইনজেকশন দিতে হয়।

ডোজ: সাধারণত শূন্য, ৩, ৭ এবং ২৮তম দিনে এই টিকা দেওয়া হয় চিকিৎসকের পরামর্শে।

কোথায় পাবেন: সরকারি পর্যায়ে জেলা সদর হাসপাতাল এবং ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এই টিকা বিনা মূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কাছের ফার্মেসিতেও টিকা কিনতে পাওয়া যায়।

করণীয় ও সচেতনতা
পোষা কুকুর বা বিড়ালকে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দিন।
বেওয়ারিশ কুকুরকে উত্ত্যক্ত করবেন না।
কামড় দিলে রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষত সেলাই করবেন না কিংবা তাতে চুন, লবণ বা মাটি লাগাবেন না।
বেজবড়ি বা ঝাড়ফুঁক করে সময় নষ্ট করবেন না।
জলাতঙ্ক একটি নিরাময়-অযোগ্য; কিন্তু শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে অবহেলা না করে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিলে একটি মূল্যবান জীবন বাঁচানো সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করতে।

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED