শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন
Logo

৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রা: রাজপথে শক্তির জানান দিবে বিএনপি

/ ২৭ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

অনলাইন ডেক্স ।।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য নিয়মিত বিরতিতে লংমার্চ-সমাবেশ করছে। বিপরীতে ক্ষমতাসীন বিএনপি মাঠে তেমন উপস্থিত নেই। এবার সেই চিত্রে বদল আনতে আগ্রহী দলটি। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে তারা রাজধানীতে শোভাযাত্রা আয়োজনের মাধ্যমে রাজপথে শক্তির জানান দিতে চায়।

দলীয় এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রায় ২১ বছর আগে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন তিনি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে শনিবারের (৭ নভেম্বর) বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে হতে যাওয়া কর্মসূচিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দল। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নিয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।

২১ বছর আগে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সেই শোভাযাত্রা

বিএনপির ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২০০৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিকেল ৫টায় শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এতে রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটের কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন।

এরপর ২০০৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আরেকটি বড় শোভাযাত্রা হয়। তবে সেটিতে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানও এতে কখনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে হেঁটেছেন, কখনো গাড়িতে ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পর কারাবন্দি ছিলেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার পর নির্বাচনি প্রচারে বিভিন্ন এলাকায় জনসভায় অংশ নেন।

তবে এবারের ৭ নভেম্বরের কর্মসূচির বিশেষত্ব হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা হতে যাচ্ছে। ফলে দুই দশকের বেশি সময় আগের সেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রার সঙ্গে এবারের কর্মসূচির একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।

সাংগঠনিক শক্তির জানান দিতে চায় বিএনপি

এ শোভাযাত্রাকে শুধু ঐতিহাসিক দিবস উদযাপনের কর্মসূচি নয়; সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, ঐক্য ও রাজপথের সক্ষমতা তুলে ধরার উপলক্ষ হিসেবেও দেখছে বিএনপি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য, ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ও তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে বড় জমায়েতের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায় দলটি।

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বড় সাফল্যের পরও বিএনপি কোনো বিজয় র‍্যালির আয়োজন করেনি। সেই সঙ্গে সরকার গঠনের প্রায় সাড়ে আট মাস পেরিয়ে গেলেও রাজপথে বড় পরিসরে কর্মসূচি দেয়নি দলটি। ফলে ৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রাকে ঘিরে এবার শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গত ২৬ অক্টোবর দলের যুগ্ম মহাসচিব এবং ঢাকা মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যৌথসভা করেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ওই সভা থেকে কর্মসূচি সফল করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরপর ঢাকা মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক সভা হয়। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নিজ নিজ এলাকায় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন টিম গঠন করে দায়িত্বও বণ্টন করা হয়।

বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির আশা

এ নিয়ে কথা হলে যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচি ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচিতেই যুবদলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আগামীকালও কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর ঢল নামবে।

তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন করতে চায়—এমন শক্তির সঙ্গে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গুপ্তরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে এবং বহিরাগতদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা সফল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বিএনপি জনগণের পাশে থাকে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দলটি সজাগ রয়েছে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন জানান, শোভাযাত্রা সফল করতে এরই মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের জেলার নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন তারা। যুবদলের পক্ষ থেকেই লক্ষাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতি থাকবে বলে প্রত্যাশা তার।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, কর্মসূচি সফল করতে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করছে। কারণ, এতে তাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্ব দেবেন।

ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানও বলেন, ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচি ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

‘দল র‍্যালি-সমাবেশ করলে মানুষের কাছে বার্তা যায়’

কর্মসূচি নিয়ে আলাপকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ‘বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। কোনো রাজনৈতিক দল র‍্যালি বা সমাবেশ করলে জাতীয় পর্যায়েও মানুষের কাছে একটি বার্তা যায়। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল, এখনো আছে। দেশের যে কোনো প্রয়োজনে দল ও সাংগঠনিক নেতারা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবেন। সেটা শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ কিংবা বিরোধীদল—যেই হোক না কেন।’

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তারা মনে করেন না যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন। যদি ফেরেন, তাহলে সারাদেশের মানুষই তার ব্যবস্থা নেবে। তারাও বাংলাদেশের মানুষের অংশ হিসেবে সেখানে থাকবেন।

বিরোধীদলগুলোর কর্মসূচি ও নেতাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে রবিন বলেন, ‘তারা ক্ষমতার জন্য পাগল হয়ে গেছে। একটি সরকারের মাত্র আট-নয় মাস হয়েছে। এরই মধ্যে তারা আবোল-তাবোল কথা বলছে এবং বিনা কারণে লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করছে। এসব করে তারা কোনো সুফল পাচ্ছে না।’

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনায় গুরুত্ব
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে দলের নেতারা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ৭ নভেম্বরের চেতনাকে সামনে আনছেন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা, গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং মানুষের কথা বলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

তার ভাষ্য, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা এবং জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একে একে বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন।

রিজভী বলেন, পরবর্তী সময়ে দেশে একদলীয় ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হলে জনগণ ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছে। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা গেছে বলে মনে করেন তিনি।

সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাতদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জাতীয় নেতারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন।

এছাড়া রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা ছাড়াও দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে। ৮ নভেম্বর সারাদেশের থানা ও উপজেলা পর্যায়ে শোভাযাত্রা করবে দলটি।

অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও পৃথক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ১০ নভেম্বর যুবদলের আলোচনা সভা, ৫ নভেম্বর শ্রমিক দলের আলোচনা সভা, ৯ নভেম্বর বেলা ১১টায় কৃষক দলের আলোচনা সভা এবং একই দিন বিকেল ৩টায় জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

ছাত্রদল ৭ নভেম্বর বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং ৮ নভেম্বর আলোচনা সভা করবে। ওলামা দল এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com