অনলাইন ডেক্স ।।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও খাদ্যঘাটতিতে টালমাটাল, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন—শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, সৎ প্রশাসন এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি।
তার সেই দর্শনেরই প্রতিফলন ছিল ‘খাল কাটো, দেশ গড়ো’ কর্মসূচি। এটি নিছক একটি উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না; বরং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে দেশ পুনর্গঠনের এক অর্থনৈতিক দর্শন।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের প্রাণশক্তি গ্রামে, আর কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশের অর্থনীতি।
স্বাধীনতার পর দেশের কৃষি ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত।
দুর্বল সেচব্যবস্থা, উৎপাদন কম, গ্রামীণ অবকাঠামো ছিল অনুন্নত। এই বাস্তবতায় তিনি খাল খনন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল সংস্কার ও খননের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে গতি আসে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়।
সত্তরের দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে তার সরকারের বাস্তবমুখী নীতির বড় ভূমিকা ছিল বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
কৃষি খাতে ভর্তুকি, সেচসুবিধা সম্প্রসারণ, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের বিস্তারের মাধ্যমে তিনি উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার উন্নয়ন দর্শনের মূলে ছিল—রাষ্ট্রের অগ্রগতি শহরকেন্দ্রিক নয়, বরং গ্রাম ও কৃষিকে কেন্দ্র করেই হতে হবে।
এই ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে হত্যা করা হয়। তবে মৃত্যুর আগে তিনি শুধু অর্থনৈতিক নয়, আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও রেখে যান সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের স্বপ্ন প্রথমদিকেই দেখেছিলেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে সেই উদ্যোগই রূপ নেয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্কে। বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদের লেখায় উঠে এসেছে, আশিয়ান জোটের আদলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তিনি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল সফর করে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৯৮০ সালের ২ মে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো এক ঐতিহাসিক চিঠিতে তিনি আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেন।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হককে বিভিন্ন দেশে পাঠান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহের সঙ্গে তার নিবিড় আলোচনা সার্ক গঠনের পথ প্রশস্ত করে। শুরুতে ভারত ও পাকিস্তান কিছুটা সংশয়ে থাকলেও জিয়াউর রহমান তার বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হন, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্বার্থেই এই সহযোগিতা কাঠামো প্রয়োজন।
যদিও ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, তার আগেই নিহত হন জিয়াউর রহমান। ফলে সংগঠনটির বাস্তবায়ন তিনি দেখে যেতে পারেননি। তবু তাকে সার্কের অন্যতম ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ ও ‘স্থপতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তিনি বাস্তববাদী কূটনীতির পরিচয় দেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের যে প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনেও জিয়াউর রহমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ছিলেন সংযমী ও মিতব্যয়ী। বঙ্গভবনের সাবেক কর্মকর্তাদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে—রাষ্ট্রপতির পদে থেকেও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতাকে প্রশ্রয় দেননি। সরকারি সম্পদের ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সরকারি গাড়ি কিংবা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি তিনি অনৈতিক মনে করতেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতেন।
জানা যায়, সন্তানরা স্কুলে যাওয়ার জন্য বড় সরকারি গাড়ি ব্যবহার করলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন এবং কম জ্বালানি খরচ হয় এমন ছোট গাড়ি ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের মিতব্যয়িতা অনেকের কাছেই বিরল উদাহরণ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে যেমন শৃঙ্খলা ও কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও তিনি সেই একই নীতি অনুসরণ করেন। প্রশাসনিক কাজে অযথা বিলম্ব কিংবা গাফিলতি তিনি পছন্দ করতেন না। কর্মকর্তাদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল—রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনগণের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত; তাই দায়িত্ব পালনে অবহেলার সুযোগ নেই। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানতে তিনি সরাসরি আগ্রহী ছিলেন এবং শুধু কাগুজে প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট থাকতেন না।
শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক চর্চা পুনঃপ্রবর্তনে তিনি ভূমিকা রাখেন। রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি, সংবাদপত্রের পরিসর উন্মুক্ত করা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ফলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাল ধরেন তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। গত বছরের ডিসেম্বরে বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। বেঁচে থাকাকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বেগম জিয়া উল্লেখ করেছিলেন, দেশের কাজ নিয়েই অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকতেন জিয়াউর রহমান। একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার পুরো যাত্রাপথে দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠাই ছিল তার জীবনের মূল ভিত্তি।