নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সকাল থেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি মাদরাসাশিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার আশায় তারা দিনভর ছুটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। কিন্তু দিন শেষে চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাই পাওয়া যায়নি।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের রাজগুরু কেরাতুল কোরআন কওমি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ঈদের দিন সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ করেছেন তিনি। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মাদরাসার সহযোগিতায় মোট ২২০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর শুরু হয় বিপত্তি।
তিনি বলেন, কয়েকজন পাইকারকে ফোন দিয়ে অনুরোধ করেছি, কেউ সাড়া দেয়নি। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রহমতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চামড়াগুলো নিয়ে সারারাত অপেক্ষা করেছি। কোনো ক্রেতা পাইনি। ফেলে গেলে পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে, মানুষের কষ্ট হবে ভেবে সেখানেই ছিলাম। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার (২৯ মে) সকালে গৌরনদীর টকরি বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ট্যানারি মালিকের কাছে জোর করে চামড়াগুলো দিতে হয়েছে। তিনি ২২০টি চামড়ার জন্য ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন। এতে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে মাত্র ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর কেউ আর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহী হবে না।
শুধু বাবুগঞ্জ নয়, বরিশালের উজিরপুর, মুলাদী ও হিজলা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহকারী মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। চামড়া পরিবহনে যে ভ্যান ভাড়া ও শ্রমিক খরচ হয়েছে, বিক্রির টাকা দিয়ে সেটিও উঠছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গরুর চামড়া অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে চামড়া সংগ্রহ করেছে, আবার কোথাও নামমাত্র মূল্য দিয়ে চামড়া কিনতে দেখা গেছে।
চামড়া বিক্রেতারা জানান , বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। তাদের নির্ধারণ করা দামের বাইরে চামড়া বিক্রি করার সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং চামড়ানির্ভর ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
একজন স্থানীয় বিক্রেতা বলেন, সরকার যে মূল্য ঘোষণা করেছে, বাস্তবে তার অর্ধেক দামও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় কিছু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।
বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা তীরবর্তী ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকায়ও ঈদের দিন মাদরাসার শিক্ষক ও প্রতিনিধিদের চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। নগরের জামিয়াতুল মাদরাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি ৪২টি বড় গরুর চামড়া ৪৫০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। পরে আরও কিছু চামড়া নিয়ে এলে পাইকাররা আগের চেয়েও কম দাম প্রস্তাব করেন।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা অবশ্য বাজার পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি মালিকদের দায়ী করছেন। তাদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে দীর্ঘদিনের বিপুল অঙ্কের পাওনা বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে লবণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।
ব্যবসায়ীরা বলেন, বর্তমানে বড় গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৩০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে কিনতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগে এ বছর প্রায় ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত বছর বরিশাল জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। চলতি বছর কোরবানির জন্য ১ লাখ ২৯ হাজার গরুর সরবরাহ ছিল। প্রকৃত কোরবানির সংখ্যা কয়েক দিনের মধ্যে জানা যাবে। তিনি বলেন, চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।