মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন
Logo
সর্বশেষ :
সমস্যা থাকবেই, তার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে: প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলার ডুবি, ৬ জেলে নিখোঁজ বরিশালের ইয়াবাসহ ব্রাজিল সমর্থক গ্রেপ্তার বরিশালসহ ১৮ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত অক্টোবরেই শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, প্রথম ধাপে ইউপি ও পৌরসভা হিজলায় ছাত্রদল নেতার মোটরসাইকেল বহরে হামলা-ভাঙচুর খাগড়াছড়িতে দুপক্ষের গোলাগুলি, নিহত ৩ বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম না থাকলে লাইসেন্স বাতিল : স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারি ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সম্পাদকের বাগবিতণ্ডা, চরম হট্টগোল

চীনে বিনোদন তারকাদের ওপর কেন ক্ষোভ বাড়ছে, কনসার্ট বাতিলে কেন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ

/ ২১ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

অনলাইন ডেক্স ।।

বিনোদন জগতে ক্যারিয়ার গড়া বা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তাই শেষ কথা—এমনটাই প্রচলিত ধারণা। তবে চীনের এক নম্বর টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব শিয়ে না-র ক্ষেত্রে কোটি ভক্তের ভালোবাসাও শেষ রক্ষা করতে পারল না। সম্প্রতি দেশজুড়ে তাঁর প্রথম একক কনসার্ট ট্যুরের একটি উদ্যোগ চরম ব্যর্থতা ও অপমানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

চলতি মাসের শেষের দিকে রাজধানী বেইজিংয়ে শিয়ে না-র এই সংগীত সফরের প্রথম কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের শেষভাগে আকস্মিকভাবেই সেটি বাতিল করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর গান গাওয়ার দক্ষতা নিয়ে ব্যাপক বিদ্রূপ ও প্রশ্নের পর, এমনকি খোদ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে সমালোচনা করা হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের বিনোদন জগতের তারকাদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। বর্তমান চীনে তরুণদের অর্থনৈতিক মন্দা ও সামাজিক হতাশা প্রকাশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন সে দেশের ধনী ও প্রভাবশালী তারকারা।

গত দুই দশক ধরে চীনের অত্যন্ত জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘হ্যাপি ক্যাম্প’-এর অন্যতম প্রধান মুখ শিয়ে না। অভিনয়ে ছোটখাটো চরিত্র দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও নিজের হাসিখুশি ব্যক্তিত্ব এবং কমিক টাইমিংয়ের জোরে দ্রুতই তিনি চীনের প্রথম সারির টেলিভিশন তারকা হয়ে ওঠেন।

তবে শিয়ে না-র দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পেশাদার গায়িকা হওয়া। চলতি বছরের এপ্রিলে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ওয়েইবো-তে তিনি লেখেন, ‘এ বছর অবশেষে আমার এই স্বপ্নটি পূরণ করার সুযোগ পেয়েছি।’ এর পরপরই চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আধুনিক শহর চেংদুতে তাঁর প্রথম একক কনসার্টের ঘোষণা দেন তিনি।

টিকিট ছাড়ার মাত্র আট মিনিটের মাথায় সবগুলো টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এতে শিয়ে না নিজেও বিস্মিত হয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘উত্তেজনায় আমার হাত কাঁপছে।’ মে মাসে চেংদুতে অনুষ্ঠিত তাঁর দুটি কনসার্ট ভক্তদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলে। সেখানে তাঁর তারকা বন্ধুদের সঙ্গে নস্টালজিক পারফরম্যান্স প্রশংসিত হয়।

এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিয়ে না এক লাইভস্ট্রিমে নিজের গায়কি নিয়ে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত আমার দম ফুরিয়ে যায়নি। আমি চাইলে একজন “পপ কুইন” হতে পারতাম।’ এরপরই তিনি বেইজিং, যেখানে টিকিটের মূল্য ধরা হয়েছিল ৩৮০ থেকে ১ হাজার ১৮০ ইউয়ান (৫৬ থেকে ১৭৪ ডলার), সেখান থেকে দেশব্যাপী সংগীত সফর শুরুর ঘোষণা দেন।

জনরোষ ও সরকারি সংবাদমাধ্যমের কড়া বার্তা
বেইজিং কনসার্টের ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুর বদলাতে শুরু করে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, শিয়ে না-র মতো একজন ‘বাজে’ গায়িকা কীভাবে কনসার্ট করার সাহস পান? অভিযোগ ওঠে, তিনি গান গাওয়ার চেয়ে তারকা বন্ধুদের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে সহজে অর্থ উপার্জনের ধান্দা করছেন।

ক্ষোভের পারদ এতটাই চড়ে যে, অনেকে সরকারি দপ্তরে শিয়ে না-র কনসার্টের অনুমতি বাতিলের জন্য লিখিত অভিযোগও দেন। ভাইরাল হওয়া এক স্ক্রিনশটে দেখা যায়, কেউ একজন শিয়ে না-র স্বামী (যিনি একজন পেশাদার গায়ক)-কে সরাসরি মেসেজ দিয়ে লিখেছেন, ‘আপনার স্ত্রীকে থামান।’

বিষয়টি সাধারণ ট্রোলিং বা অনলাইন সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে যায় যখন চীনের সরকারি মাধ্যম ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তারা এতে নাক গলান।

গত মাসে জেনজিয়াং প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কমিটির একটি বিভাগ থেকে প্রকাশিত নিবন্ধে শিয়ে না-র এই সফরকে ‘স্বপ্ন পূরণ নয়, বরং স্রেফ মুনাফা কামানোর চেষ্টা’ বলে অভিহিত করা হয়। সেখানে কড়া ভাষায় বলা হয়, ‘কেবলই চটকদার জনপ্রিয়তা কোনো টেকসই লাভ এনে দেয় না, বরং তা সংস্কৃতির মান নষ্ট করে।’

এর পরপরই চীনের প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় পত্রিকা পিপলস ডেইলি একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে সরাসরি শিয়ে না-র নাম না নিয়ে বলা হয়, ‘একজন জনপ্রিয় তারকা, যাঁর মূল কাজ উপস্থাপনা এবং যাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য মৌলিক গান নেই—তিনি স্রেফ জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করছেন। যোগ্যতা ছাড়া যারা পরিচিতি পান, তারা শেষ পর্যন্ত বিপদে পড়তে বাধ্য।’

এই তীব্র চাপের মুখে গত সপ্তাহে কনসার্ট আয়োজক প্রতিষ্ঠান বেইজিংয়ের শো-টি বাতিল করে এবং টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে এটি সরকারি কোনো নির্দেশে বাতিল হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। শিয়ে না নিজেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ইন্টারনেট ও পপ সংস্কৃতি বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ড. জিয়ান শু মনে করেন, এটি সম্ভবত তারকা ব্যবস্থাপনা দল ও আয়োজকদের একটি ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ বা আত্মরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত ছিল।

তারকাদের প্রতি ক্ষোভের কারণ কী?
চীনে অভিনেতাদের বা টেলিভিশন তারকাদের কনসার্ট করা নতুন কিছু নয়। কিন্তু শিয়ে না-র ক্ষেত্রে কেন এত তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো?

ড. জিয়ান শু-র মতে, এই ক্ষোভের মূল উৎস চীনের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নিহিত। করোনা মহামারির পর থেকে চীনের কোটি কোটি তরুণ বেকারত্ব, তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ও মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

‘এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের চোখে তারকারা অত্যন্ত সহজে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছেন। শিয়ে না-র কনসার্টটি মূলত চীনের সমসাময়িক আয় বৈষম্য এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অসম বণ্টন নিয়ে তরুণদের মনের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর একটি রাস্তা করে দিয়েছে,’ বলেন ড. শু।

এর আগে গত মাসে বিখ্যাত চীনা গায়িকা হান হং একটি স্পাই থ্রিলার চলচ্চিত্রের প্রচারে ভক্তদের কাছে আবেগঘন অনুরোধ করার পর সমালোচনার মুখে পড়েন। ভক্তরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘আবেগীয় ব্ল্যাকমেল’ বা ভুল বোঝানোর অভিযোগ তুললে তিনি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।

চীনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারকাদের সমালোচনা করাকে অন্যতম ‘নিরাপদ’ সমালোচনা বলে মনে করেন বেইজিং-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ও নিউজলেটার ‘পিকিংনোলজি’-র প্রতিষ্ঠাতা জিচেন ওয়াং।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘চীনে সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি কথা বলা বিপজ্জনক। ফলে তারকারা হয়ে ওঠেন তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষ সরাসরি রাজনৈতিক ঝুঁকি না নিয়ে যোগ্যতা, বিশেষ সুবিধা, অর্থ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিতে পারে।’

দেশীয় সংস্কৃতি নাকি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ?
তবে এই ঘটনায় চীনের ভেতরেই ভিন্ন এক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। জিচেন ওয়াং প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের অনলাইন সমালোচনাকে কি রাষ্ট্রীয়ভাবে বা প্রশাসনিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত?

‘একটি সমাজে মানুষের রুচি বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে জোরালো মত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত রুচি যেন কখনো প্রশাসনিক ক্ষমতায় রূপ না নেয়। কোনো তারকাকে অপছন্দ করার মানে এই নয় যে তাকে সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে বাতিল (ক্যানসেল) করে দেওয়া যাবে,’ বলেন ওয়াং।

ওয়েইবোতে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আপনার যদি তাঁর গান ভালো না লাগে, তবে টিকিট কিনবেন না। কিন্তু অন্য একজন মানুষ তাঁর উপার্জনের টাকা কোথায় খরচ করবে, তা নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যথা কেন?’

অন্য এক মন্তব্যে বলা হয়, ‘তাঁর গান যদি খারাপ হয়, তবে দর্শক না গিয়ে বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমেই তাঁর উপযুক্ত বিচার হতো। এর জন্য তাঁকে সামাজিকভাবে এভাবে অপদস্থ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com