বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৪৮ অপরাহ্ন
Logo

তিন সন্দেহে বরিশালে মাঠে পুলিশ, হেমায়েতপুরে জেএমবির আস্তানায় অভিযান!

/ ১৮ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণে বুধবার (১২ আগস্ট) বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটেছে। মহানগর দায়রা জজ আদালতের ১০ তলা ভবনের সামনে প্রধান ফটক থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে সকাল সাড়ে ১০টায় বিস্ফোরণটি ঘটে।

এর আগে মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকার সাভারে সাদাপুর গোপের বাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠ থেকে ‘প্রেশারকুকার বোমা’ উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে বিস্ফোরণের মাধ্যমে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এ সময় বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। নিরাপদ দূরত্বে থেকে শত শত উৎসুক মানুষ ঘটনাটি দেখেন।

মঙ্গলবার মধ্যরাতে বোমাটি উদ্ধারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সাভারে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ১৫টি পাইপ বোমা ও বিস্ফোরকসহ আরিফ নামে এক সক্রিয় সদস্যকে আটক করে সিটিটিসি। এর আগে ৩১ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ফেলে যাওয়া প্রেশারকুকার বোমা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। পরপর বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে বরিশালে বিস্ফোরণের ঘটনায় জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা দেখছে না পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তিনটি কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। প্রধান কারণ, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো। দ্বিতীয়ত, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর মাস আগস্টকে কেন্দ্র করে এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সফরের পর ডাচ রাষ্ট্রদূতের বরিশালে আসার কর্মসূচিকে ঘিরেও বিস্ফোরণটি ঘটানো হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। কয়েকদিন আগে বাকেরগঞ্জে ঘটে যাওয়া আরেকটি বিস্ফোরণের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বরিশালে বিস্ফোরণ: সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের ইনচার্জ খলিলুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে কাচের গুঁড়া, বারুদের উপকরণ ও প্লাস্টিকসহ আলামত সংগ্রহ করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিস্ফোরণের ধরন ও ব্যবহৃত বিস্ফোরক সম্পর্কে জানা যাবে।’

ঘটনার পর আদালত প্রাঙ্গণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যান বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ। আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নাজিমউদ্দিন আহম্মেদ পান্না ও আইনজীবী তসলিমউদ্দিন আহম্মেদ নাশকতার জন্য পলাতক ফ্যাসিস্টের সহযোগীদের দায়ী করেন।

তবে মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, আলামত ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে জঙ্গি বা উগ্রবাদীদের সংশ্লিষ্টতার মতো কিছু পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে জর্দার কৌটার মুখও পাওয়া গেছে। তার ধারণা, এটি বড়জোর পটকা হতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ১০ তলা ভবনের ওপর বা আদালত প্রাঙ্গণের সীমানার বাইরে থেকে বস্তুটি ছোড়া হয়েছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিএমপি কমিশনার বলেন, আতঙ্ক ছড়ানোই বিস্ফোরণের একটি উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে। আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কেউ উপস্থিতির জানান দিতেও এটি করে থাকতে পারে। এছাড়া অন্য কারণও তদন্তে রাখা হয়েছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ৯ ও ১০ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বরিশাল ও ঝালকাঠি সফর করেন। বুধবার বরিশালের একটি হোটেলে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেলের সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও বিস্ফোরণটি ঘটানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেমিনারটি পরে বাতিল হয়।

এর আগে ৩ আগস্ট বাকেরগঞ্জের দুধলমৌ গ্রামে রহস্যজনক বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ তিনজন আহত হন। ওই ঘটনার সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণের বিস্ফোরণের যোগসূত্র আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে চাননি বিএমপি কমিশনার।

সাভারের সাদাপুরে আতঙ্ক: সাভার থানার ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ইমরান হোসেন বলেন, লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠে বুধবার রাত দেড়টার দিকে স্থানীয়রা একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর কাপড়চোপড়, কুরআন শরিফ ও একটি প্রেশারকুকার দেখতে পান। পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, অজ্ঞাতনামা তিন ব্যক্তি রাতে ড্রামটি মসজিদের মাঠে রেখে যায়। সকালে পুলিশ এলাকা ঘিরে ফেলে এবং সিটিটিসি ইউনিটকে বিষয়টি জানানো হয়। সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জেএমবির আস্তানায় অভিযান: এর আগে সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুর একটি বাড়িতে রাতভর অভিযান চালিয়ে জেএমবির সক্রিয় সদস্য আরিফকে আটক করে সিটিটিসি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী এলাকার আরিফ ১ আগস্ট ড্রাইভিং ও শিক্ষকতার ভুয়া পরিচয় দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেন। আরিফের কাছ থেকে জেএমবির বিপুল পরিমাণ লিফলেটও উদ্ধার করা হয়েছে।

ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, আরিফের সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় লুকানো ছয়টি শক্তিশালী পাইপ বোমা ও বিভিন্ন কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়। পরে বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও ৯টি পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে মোট ১৫টি পাইপ বোমা নিষ্ক্রিয় করে আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

শ্যামপুরে প্রায় ৪ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর মঙ্গলবার রাত ১০টায় আব্দুল জলিলের বাড়িতে অভিযান চালায় সিটিটিসি। ওসি সাইফুল আলম বলেন, পুরো এলাকা ঘিরে রেখে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সফলভাবে কাজ শেষ করেছে।

বাড়ির মালিকের মেয়ে ইলমা রহমান বলেন, ১ আগস্ট বাসাটি ভাড়া দেওয়া হয়। ভাড়া নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, স্বামী-স্ত্রী থাকবেন এবং পাশের একটি স্কুলে বাচ্চাদের পড়াবেন। ভেতরে এত ভয়ংকর পরিকল্পনা চলছিল, তা তারা বুঝতে পারেননি।

বোমারু মামুন এখনো অধরা: সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়া ও রাজধানীর মতিঝিলে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নেমে দুজনকে শনাক্ত করে সিটিটিসি। তাদের একজন আরিফ। অন্যজন নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’। আরিফ আটক হলেও মামুন এখনো ধরা পড়েননি।

৩১ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি প্রেশারকুকার বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে রাধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকেও বোমা উদ্ধার করা হয়। দুটি ঘটনার যোগসূত্র, বোমার উৎস, নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং কোনো উগ্রপন্থি নেটওয়ার্ক রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে সিটিটিসি। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ছায়া অনুসন্ধানে নামে।

মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার ও দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অনেক আলোচিত জঙ্গি সদস্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তি পান। তাদের অনেকে কারাগার থেকে পালিয়ে বা মুক্ত হয়ে ছোট ছোট সেল গঠন করেন। নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়নের উৎস তৈরি ও বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেন। ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী ছাতাবোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে মামুনকে শনাক্ত করে পুলিশ।

২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর থেকে মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে সময় তিনি নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও শুরা সদস্য ছিলেন। একই বছরের ১৫ আগস্ট পান্থপথের একটি হোটেলে নব্য জেএমবির সদস্যরা আস্তানা গড়েছিল। সেখানে সিটিটিসির ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ অভিযানে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক মূল হামলাকারী নিহত হন। ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট ওই সন্ত্রাসী হামলা মামলার অভিযোগপত্র ও পুলিশের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও মামুনের নাম ছিল।

পুলিশ জানায়, জঙ্গি সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ, বিস্ফোরক তৈরি, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন মামুন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ ও সাভারে বসবাস শুরু করেন। তার সঙ্গে শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জন যুক্ত হন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com