অনলাইন ডেক্স ।।
৩০ মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী।
১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় নিহত হন তিনি।
এরপর থেকে দিনটি বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী’ হিসেবে পালন করে আসছে। তবে এবারের ৩০ মে অনেক কারণেই ব্যতিক্রম।
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিবসটি পালিত হতে যাচ্ছে, যখন বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে এবারের শাহাদাতবার্ষিকী শুধু শোকের নয়, বরং রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং সাংগঠনিক শক্তি নতুনভাবে তুলে ধরার একটি বড় উপলক্ষ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
জিয়াউর রহমানকে ঘিরে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন বিএনপির নেতারা বরাবরই দাবি করে আসছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বিএনপির মূল রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিবছর ৩০ মে এলে দলটির নেতারা তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় ঐক্য, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচির কথা স্মরণ করেন। আলোচনা সভা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তব্যেও উঠে আসে তার অবদানের প্রসঙ্গ।
খালেদা জিয়ার আমলে যেভাবে পালিত হতো
বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে, বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সে সময় ৩০ মে ছিল দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির দিন।
সকালে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। খালেদা জিয়াও প্রায় প্রতি বছর সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।
দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে থাকত কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, এতিম ও দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ, রক্তদান কর্মসূচি, আলোচনা সভা, স্মরণসভা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মিলাদ মাহফিল এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় আলোচনা সভায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখতেন। দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে অনেক সময় এসব আয়োজন বড় রাজনৈতিক সমাবেশের রূপ নিত।
বিরোধী দলে থাকাকালে পালনের চিত্র
২০০৯ সালের পর দীর্ঘ সময় বিএনপি বিরোধী দলে থাকায় দিবসটির আয়োজনের ধরনেও পরিবর্তন আসে।
দলটির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি পালনে প্রশাসনিক অনুমতি, সমাবেশের সুযোগ এবং রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে বড় জনসমাবেশের পরিবর্তে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, সীমিত পরিসরের শ্রদ্ধা নিবেদন ও সামাজিক কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ সময় লন্ডনে অবস্থানরত দলের তখন-কার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও বার্তা বা লিখিত বাণীর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সীমিত পরিসরে কর্মসূচি পালন করা হতো।
কেন ব্যতিক্রম এবারের আয়োজন
এবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা কাজ করছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আট দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে কালো পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, দোয়া মাহফিল এবং দুস্থদের মাঝে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করা হবে।
এছাড়া সকাল ১১টায় শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের সিনিয়র নেতারা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এবারের কর্মসূচিতে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ের স্মরণসভা, যেখানে মন্ত্রিসভার সদস্য, জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও কূটনীতিকদের উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।
এছাড়াও শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, সামাজিক কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, বৃক্ষরোপণ এবং মানবিক উদ্যোগের আয়োজন থাকতে পারে।
নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তরুণদের অংশগ্রহণে সেমিনার, কর্মশালা ও আলোচনা সভার আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বিত কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন নেতারা।
বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুস সাত্তার বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ বিএনপির রাজনীতির ভিত্তি। দীর্ঘদিন পর এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে আমরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আরও ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারব।
ঢাকা মহানগরের কদমতলী থানার যুগ্ম আহ্বায়ক বাদল রানা বলেন, আমরা চাই দিবসটি শুধু রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাক। যাতে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে দেশকে তার স্বপ্নের মতো গড়ে তোলা যায়।
যুবদলের ৫২ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি আতাউর রহমান সানি বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অবদান তুলে ধরা এবারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
স্বেচ্ছাসেবক দলের ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা আক্তারুজ্জামান সোহেল বলেন, দোয়া ও শ্রদ্ধার পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে তার প্রতি প্রকৃত সম্মান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, ৩০ মে বিএনপির জন্য শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি দলটির সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ কর্মপথ তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের শাহাদাতবার্ষিকী কর্মসূচি একদিকে যেমন আবেগঘন, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রও হতে পারে।
চার দশকেরও বেশি সময় আগে নিহত হওয়া জিয়াউর রহমান এখনও বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রতীক। তাই প্রতি বছরের মতো এবারও ৩০ মে ঘিরে শোক, স্মরণ, দোয়া এবং রাজনৈতিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা তাদের প্রতিষ্ঠাতাকে স্মরণ করবেন।
তবে রাজনৈতিক মহলে ধারণা, ২০২৬ সালের আয়োজন অতীতের বহু বছরের তুলনায় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যাপক হতে যাচ্ছে।