শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন
Logo
সর্বশেষ :
এতিম লামিয়ার বিয়েতে শতাধিক ‘ভিআইপি অতিথি’ গৌরনদীতে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ, যুবক আটক বরগুনায় সাঁকো পার হতে গিয়ে খালে পড়ে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু ঝালকাঠিতে আগুনে ভস্মীভূত ৮ দোকান, ক্ষতি ২৯ লাখ টাকা ববিতে আবারও র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, নবীন শিক্ষার্থী জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে বরিশালে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এডিস মশার বিস্তার রোধে কমিউনিটি ডায়ালগ গলাচিপায় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ৫০ বরিশালের স্বাস্থ্যখাত : চিকিৎসক-জনবল-ওষুধ সংকটে বেহাল দশা! বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত: স্মরণসভায় বিশিষ্টজনদের শ্রদ্ধা ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ড্রেজার ও বাল্কহেডসহ আটক ৭

নদী, পুকুর ও খাসজমি: বরিশালে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের মচ্ছব

/ ৯৯ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

কাজী মিজানুর রহমান ॥

আসলে বরিশালে হচ্ছেটা কী? পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের যেন এক মচ্ছব শুরু হয়েছে। কীর্তনখোলায় অনুমোদিত কোনো বালুমহাল না থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে বালুখেকো সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী মহল চরবাড়িয়া, লামছড়ি ও চরমোনাই এলাকায় শক্তিশালী সাকশন ড্রেজার দিয়ে বালু ও মাটি তুলছে। অপরিকল্পিতভাবে খননের ফলে মানুষের বসতঘর, আশ্রয়স্থল ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে শহর রক্ষা বাঁধ। নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যাওয়ায় তীর ভাঙনের প্রবণতা বাড়ছে, বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। হুমকির মুখে পড়ছে কীর্তনখোলা সেতুও।

আমানতগঞ্জ টিবি হাসপাতাল সংলগ্ন নিচু সরকারি খাসজমি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ১০-১৫ বছর আগে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ওই জমি বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১১ জনকে বিবাদী করে মামলা করেছে এবং জমিটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ভরাট নিষিদ্ধ করে সেখানে সাইনবোর্ডও লাগিয়েছে। একই সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বেহাত হওয়া খাসজমি সরকারি খাতে ফিরিয়ে আনতে মামলার উদ্যোগ নিয়েছেন।

এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা কলেজের নার্সিং ইনস্টিটিউট/কলেজ তাদের দুটি পুকুর ভরাটের উদ্যোগ নিয়েছিল। কলেজের অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ভরাট বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর একটি পুকুর ভরাটের কথাও শোনা যাচ্ছে। আপাতত সেটিও স্থগিত করা হয়েছে।
এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরিশাল অঞ্চল ঝুঁকির মুখে। জলাবদ্ধতায় নগরবাসী নাকাল, সরকারও বিব্রত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলে ভূমির তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ছে। এর ওপর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং প্রাকৃতিক কারণে ধীরগতির ভূমি অবনমনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও।
এ অবস্থায় পরিবেশ আইনবিরোধী কর্মকা- প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চোখের সামনে কীভাবে অবলীলায় চলতে পারে, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। নাগরিক সমাজ মনে করে, সরকারি দপ্তরের যেসব ব্যক্তির সহায়তায় সরকারি খাসজমি ব্যক্তি মালিকানায় বিএস রেকর্ডভুক্ত করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূমিখেকোদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিটি কর্পোরেশন টিবি হাসপাতালের জমি রক্ষায় সেখানে খেলার মাঠ করার কথা বলছে। তবে টিবি হাসপাতাল ও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা এবং শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সে ক্ষেত্রে খেলার মাঠের পরিবেশ হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার অনুকূল হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং পরিবেশ আইনের আওতায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এর বাইরেও নথুল্লাবাদ এলাকা এবং গোপনে বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত পুকুর ও জলাশয় ভরাটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

উল্লিখিত প্রথম তিনটি ক্ষেত্রেই জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের তৎপরতায় আপাতত ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। তবে সাময়িকভাবে বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এসব বিষয়ে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে জলাধার বা জলাশয় ভরাট এবং শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত)-এর ৬(ঙ) ধারা এবং ‘পৌর এলাকার প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’-এর ৫ ধারা অনুযায়ীও এ ধরনের কর্মকা- নিষিদ্ধ। অথচ আইনের তোয়াক্কা না করে এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যথাসময়ে যথাযথ তদারকির অভাবে পরিবেশ ধ্বংসকারী এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর ২(চ) ধারা অনুযায়ী ব্যক্তিগত পুকুরও এ আইনের আওতাভুক্ত।
সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, একজন ব্যক্তি তার জীবনের প্রয়োজনে পুকুর ভরাট করতে চাইতে পারেন। তাকে বাসস্থান করতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে জমি ভরাট বা বিক্রি করতে হতে পারে। ফলে শুধু ব্যক্তিকে নিবৃত্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। অন্যদিকে রাষ্ট্রকে জলাশয় ও পুকুর রক্ষা করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার জলবায়ু ট্রাস্টের অর্থায়নে অধিগ্রহণের মাধ্যমে পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রকল্প গ্রহণ করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

২০১০ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বরিশাল সিটি এলাকায় ৪৩৬টি বড় ও মাঝারি আকারের পুকুর চিহ্নিত করা হয়েছিল। অবাধে জলাশয় ভরাটের কারণে গত এক থেকে দেড় দশকে অন্তত ২০০টি পুকুর বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে টিকে থাকা পুকুরের সংখ্যা ২০০ থেকে ২৩৬টির মধ্যে বলে জানা যায় (সূত্র: বেলা)।

বরিশালের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নগরবাসীর সচেতন অংশগ্রহণ—এই তিনটির সমন্বয় ঘটাতে পারলে পরিবেশ ধ্বংসের এই প্রবণতা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com