পরীক্ষায় পাস করেও মেলে না পদোন্নতি, পুলিশে বাড়ছে হতাশা!

অনলাইন ডেক্স ।।

গত ১৬ বছর ধরে কনস্টেবল থেকে এএসআই হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন বজলুর রহমান (ছদ্মনাম)। তিনি ঢাকায় ২০ বছর বিভিন্ন দফতরে ডিউটি করেছেন। বারবার পরীক্ষা দিয়েও পদোন্নতি না হওয়ায় তার মধ্যে নেমে এসেছে হতাশা। এখন তার চাকরির বয়স ২২ বছর হতে চলেছে।

তিনি বলছিলেন, আর কত পরীক্ষা দেব ভাই! বিগত সময়ে ১০ বার পাস করেছি। পাঁচবার ফেল করেছি। ফলে এখন আর প্রমোশন নিতে মন চায় না। কিন্তু বৌ-বাচ্চার কথা ভাবলে মনে হয় আবারও পরীক্ষা দিই। তবে এখন ঢাকা থেকে জেলায় আসার পর মন চাচ্ছে না। ভাবছি পরীক্ষা দিয়ে কী লাভ! আমি তো সিরিয়ালে থাকলেও প্রমোশন পাবো না। আমার জীবনে মনে হয় ‘র‌্যাংক’ শব্দটি ক্যারিয়ারে লাগবে না।

শুধু কনস্টেবলই নয়, তাদের ওপরে এএসআই, এসআই এবং ইন্সপেক্টর পদে কতজন শূন্য হলো সেই অনুপাতে নিচের পদগুলোর পদোন্নতি দেওয়ার কথা। সেটাও হওয়ার কথা মেধাক্রম ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু সেই সংখ্যাটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় হতাশা রয়েছে পুলিশে।

গত বছর কনস্টেবল পদে পরীক্ষায় বসেন ২৪ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। তাদের মধ্য থেকে এমসিকিউ পাস করেন মাত্র ১০ হাজার। তাদের মধ্য থেকে আবার রিটেন ও প্যারেড মিলে সবশেষে পাস করেন ২৩৯৮ জন। তাদের মধ্য থেকে ২১০০ জন র‌্যাংক পেয়েছেন। বাকিরাও এবার পর্যায়ক্রমে পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রতি বছর দুই হাজারের বেশি পাস করলেও র‌্যাংক লাগে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ জনের। বাকিরা মেধায় টিকলেও বাদ পড়েন।

২৫ বছর ধরে কনস্টেবল পদে চাকরি করেও র‌্যাংক লাগাতে পারেননি আহমেদ হোসেন (ছদ্মনাম)। তিনি তার পেশায় প্রবেশের পর ছয় বছর থেকে পরীক্ষা দিতে শুরু করেছেন। এখনো দিয়ে যাচ্ছেন। আবার ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। ২০১৫ সালে চাকরিতে ঢুকে প্রথম পরীক্ষা দিয়েই র‌্যাংক লেগেছে কনস্টেবল সালেকিনের (ছদ্মনাম)। তিনি গত ১০ বছরে কোনো পরীক্ষাই দেননি। সবশেষ পরীক্ষা দিয়ে পাস করেই তার র‌্যাংক লেগেছে।

সালেকিন বলছিলেন, প্রথম বার পরীক্ষা দিয়েছি, তাতেই র‌্যাংক লেগে গেছে। বলা যায়, আমি ভাগ্যবান। কারণ অনেকে তো বছরের পর বছর চেষ্টা করেও পারেন না। আবার কেউ কেউ পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত।

কনস্টেবলরা জানিয়েছেন, বিগত সময়ে জেলায় যারা থাকতেন তারা বেশি বঞ্চিত হতেন এই পদোন্নতির ক্ষেত্রে। জেলায় কোনো এএসআই পেনশনে বা মারা না গেলে কনস্টেবল থেকে পদোন্নতির পরীক্ষায় পাস করলেও র‌্যাংক লাগতো না। এমনও ঘটনা রয়েছে, কোনো কোনো জেলায় কোনো বছরে কেউ র‌্যাংকই লাগাতে পারেননি। আবার এর বিপরীত চিত্রও ছিল। বিশেষ করে ঢাকায় যারা কর্মরত থাকতেন তারা পাস করলেই সহজে র‌্যাংক পেতেন। আবার ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত থেকেও পদোন্নতি পাননি এমন ঘটনাও কম নয়।

তবে ২০২০ সালের পর থেকে সেই সিস্টেমে ভাটা পড়েছে। এখন সবাই পরীক্ষা দিচ্ছেন। সেটার মেধা তালিকা হচ্ছে কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে পদ শূন্য হলেই পদোন্নতি হচ্ছে।

ঢাকায় কর্মরত একজন কনস্টেবল নাম প্রকাশ না করে বলছিলেন, আমাদের সঙ্গে ব্যারাকে থাকতেন এক বড় ভাই। তিনি ৩৫ বছর ধরে পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন। পাসও করেছেন অনেকবার। কিন্তু তার মেধাক্রমে ওপরে না থাকায় তিনি পদোন্নতি পাননি। পরে তিনি চাকরি জীবন থেকে কনস্টেবল পদেই অবসরে চলে যান।

পুলিশে ২৭০০ কনস্টেবল নিয়োগ শিগগিরই
ওই কনস্টেবল বলছিলেন, এই পদোন্নতি না পাওয়ায় অনেকের মাঝে হতাশা নেমে আসে। পদোন্নতি পেলে কিছুটা বেতন বাড়ে, সচ্ছলতা আসে পরিবারে। কিন্তু পদোন্নতি না হলে তো চরম হতাশা। যখন আমাদের সহকর্মীর পদোন্নতি হচ্ছে, পাস করেও আমার হচ্ছে না, তখন তো স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ হয়ে যায়। কাজে আর মন বসে না। অনেকে পদোন্নতি না পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যান। আবার কেউ কেউ হতাশায় ভুগতে ভুগতে জীবন শেষ করে দেন।

তথ্য বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবলরা এএসআই হওয়ার জন্য পদোন্নতির পরীক্ষা দেন। প্রতি বছর ২০ হাজারের ওপর এই পরীক্ষা দেন। কিন্তু এমসিকিউ পরীক্ষায় অর্ধেক অকৃতকার্য হন। রিটেন পরীক্ষা, ভাইভা, প্যারেড দিতে গিয়ে গড়ে ৭-৮ হাজার অকৃতকার্য হন। আর কৃতকার্য হয় মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার। আবার দুই হাজারের মধ্যে পদোন্নতির র‌্যাংক পান মাত্র ৪০০-৫০০ জন। বাকিরা পাস করলেও শুধুই সান্ত্বনা নিয়ে অপেক্ষা করেন।

ভুক্তভোগী কনস্টেবলরা দাবি জানিয়েছেন, যারা পাস করে তাদের তালিকা রেখে সদর দফতর পরের বছর তাদের পদোন্নতি দেওয়ার ব্যবস্থা করলে বিষয়টি ভালো হয়। তাদের আর বারবার পরীক্ষা দেওয়ার ঝামেলাটা মিটে যায়।

জানা গেছে, একজন কনস্টেবল সাধারণত চাকরিতে ঢোকার পর ছয় বছর পর তিনি এএসআই হওয়ার জন্য পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। পরীক্ষায় পাস করার তিন বছর পর তার চাকরি সেই পদে স্থায়ী হলো কি না আবার মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। তা নেন একজন এসপি। সেই এসপির অফিসে গিয়ে তাকে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। তবে সেখানেও ভয় থাকে বলে জানিয়েছেন একজন এএসআই।

পুলিশের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন!
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ট্রেনিং) একরামুল হাবীব বলেন, পুলিশের পদোন্নতি মূলত শূন্য পদের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়। প্রতিটি পদে যতগুলো শূন্য পদ থাকে, সে অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

এই কর্মকর্তা বলেন, যারা বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তারা অবশ্যই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে শুধু পরীক্ষায় পাস করলেই সবাই একসঙ্গে পদোন্নতি পান না। এ ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি, মেধাক্রম এবং শূন্য পদের সংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়।

অতিরিক্ত আইজি আরও বলেন, অনেক সময় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলেও শূন্য পদের সংখ্যা সীমিত থাকে। ফলে যোগ্য হয়েও অনেককে অপেক্ষা করতে হয়। তবে সরকার যদি ভবিষ্যতে পদসংখ্যা বা শূন্য পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তাহলে এ সংকট অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *