পিরোজপুর প্রতিনিধি ।।
পিরোজপুরে জমে উঠেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান নৌকার হাট। তবে ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা রোদের তীব্র তাপে পুড়ে ক্রয় বিক্রয় করতে হয় নৌকা ব্যবসায়ী আর ক্রেতাদের। মৌসুমে প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা বেচাকেনা হলেও শেড, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তার অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরাও।
পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় বর্ষা মৌসুম এলে চোখ জুড়ানো নৌকার ভাসমান হাটের দেখা মিলবে। শত শত নৌকার পসরা সাজিয়ে বসে আছে বিক্রেতারা। বছরে একবার ব্যবহার উপযোগী এই নৌকা কিনতে ভিড় জমাচ্ছেন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জায়গার মানুষ। ঘাস কাটা, মাছ ধরা, পেয়ারা, আমড়া পাড়ার প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার উপযোগী এই নৌকা কিনতে আসছেন বরিশাল, বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠি, নলছিটি, বানরীপাড়া, নাজিরপুর, গোপালগঞ্জ, বৈঠাকাটা, কাঠালিয়া ও রাজাপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ।
বছরের আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন এই চার মাস জমে ওঠে ভাসমান নৌকার হাট। তবে সারা বছরেই কমবেশি চলে এই নৌকার ক্রয়-বিক্রয়। সপ্তাহের সোম ও শুক্রবার ভাসমান এই নৌকার হাটের দেখা মিলে। তবে সপ্তাহের শুক্রবারে পুরোপুরি জমে ওঠে আটঘর কুড়িয়ানার এই ভাসমান নৌকার হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকের ভিড় লক্ষ্য করার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকেরও আগমন ঘটে এই ভাসমান নৌকার হাটে।
বর্ষা মৌসুমে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয় এই ভাসমান হাট। ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে কেনাবেচার ধুম লেগে যায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। শত বছরের এই নৌকার হাট দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা।
নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুরিয়ানায় ভাসমান নৌকার হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকালে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শাপলা ফুলের মতো ফুটে থাকে সারি সারি নৌকা। আটঘর খাল থেকে ট্রলার কিংবা ইঞ্জিন চালিত কোনো নৌকা ভাসমান হাটের গা ঘেঁষে যাওয়ার পরে সূর্যমুখী ফুলের মতো দুলতে থাকে নৌকাগুলি। এ দৃশ্য দেখলে যে কারো চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য আটকে যাবে। এমন দৃশ্য দেখতে প্রতি হাটে ভিড় করে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। তবে ভোগান্তির শেষ নেই ভাসমান নৌকার হাটের ক্রেতা বিক্রেতাদের। নেই দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট।
ক্রেতা বিক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা এই ভাসমান হাটে নৌকা কিনতে আসলেও বৃষ্টিতে পড়তে হয় ভোগান্তিতে। ভাসমান এ নৌকার হাটটি বর্ষা মৌসুমে হলেও ক্রেতা বিক্রেতাদের নিয়ে প্রশাসনের নেই কোনো পরিকল্পনা কিংবা নজরদারি। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটারি ব্যবস্থা ও বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য একটি সেট অত্যন্ত প্রয়োজন।
পর্যটকরা বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এরকম একটি মনোমুগ্ধকর জায়গায় পর্যটকদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পর্যটকদের উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
নৌকা বিক্রেতা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এই বাজার ১০০ বছর আগের পুরোনো। এখানে বছরের ছয় মাস নৌকা কেনাবেচা হয়। সব থেকে বেশি হয় বর্ষার মৌসুমে। স্বরূপকাঠি, বানারীপাড়া, উজিরপুর, নলছিটি ও ঝালকাঠির মানুষ নৌকা কিনতে আসে। নৌকা বেচা-বিক্রি করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, অনেক সময় বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। আবার তীব্র রোদে পুড়তে হয়। এটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। আমরা চাই আমাদের জন্য একটি সেডের ব্যবস্থা করে দিক।
আরেক বিক্রেতা গোলাম রসুল বলেন, এই নৌকা কিনে মানুষ পেয়ারা পারে, আমরা পারে, ঘেরের মাছ ধরে। বিভিন্ন কাজে তারা নৌকা ব্যবহার করে, কিন্তু এখানে নৌকা কেনা-বেচা করতে যারা আসে, তাদের বৃষ্টি নামলে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। নৌকা ওঠা নামানোর জন্য ঘাট দরকার, তাও নাই। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, এখানে পানি ও স্যানিটারি ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।
উজিরপুর থেকে নৌকা কিনতে এসেছেন সবুজ হাওলাদার। তিনি বলেন, গরু ছাগলের জন্য ঘাস কাটা এবং মাছ ধরার জন্য দুইটা নৌকা কিনতে আসছি। আগের থেকে দাম একটু বেশি। তারপরেও এ হাট থেকেই প্রতিবছর নৌকা কিনি। দুইটা নৌকা ৮৫০০ টাকায় কিনেছি। এখানে নৌকা কিনতে আসলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়, বৃষ্টি নামলে না ভেজার জন্য দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নাই।
পিরোজপুর থেকে ভাসমান নৌকার হাট দেখতে এসেছেন সাহারিয়ার কিঞ্জাল। তিনি বলেন, এখানে প্রায় ঘুরতে আসি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে। তবে পর্যটকদের এখানে ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, বাইক রাখার কোনো জায়গা নেই। বাইক রেখে কোথাও গেলে আতঙ্কে থাকতে হয়। এই বুঝি বাইক চুরি হয়ে গেল। এছাড়াও ভালো কোনো খাবার হোটেল নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়গুলো দেখভাল করলে আরও বেশি পর্যটকের উপস্থিতি বাড়বে।
ভাসমান নৌকার হাটের ইজারাদার আবুল বাশার বলেন, ‘প্রতিহাটে এখানে প্রায় দুইশত নৌকা বিক্রি হয়। বছরের চার মাস নৌকা বেচা-বিক্রি বেশি হয়। প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা ক্রয় বিক্রয় হয় এ হাটে। তবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য কর্তৃপক্ষের নেই কোনো উদ্যোগ। বৃষ্টিতে ভিজে এবং রোদে পুড়ে নৌকা ক্রয় বিক্রয় করতে হয়।’
জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল কবির বলেন, ‘বর্ষার মৌসুমে নৌকারহাট জমে উঠে। বর্ষাকালে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনে পিরোজপুর জেলার আশেপাশের এলাকা থেকে এখানে নৌকা কিনতে আসেন ক্রেতারা। পিরোজপুর জেলার ব্যবসায়ী সমিতি ভাসমান নৌকার হাট ভিজিট করেছে। ক্রেতা বিক্রেতাদের ভোগান্তি কমাতে জেলা পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারি অনুদানের জন্য চেষ্টা করতেছি। অনুদান পেলে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি শেড গড়ে তোলা হবে। যাতে ক্রেতা বিক্রেতাদের বৃষ্টিতে ভোগান্তি কমে।
ভাসমান এ হাটে প্রতি মৌসুমে প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা বেচাকেনা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সঠিক উদ্যোগ নিলে নেছারাবাদ উপজেলার ভাসমান এ নৌকার হাটটি বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে আটঘর করিয়ানা এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ।