বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা ও শক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের’ জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তার ভাষ্য, ‘এ বিপ্লব কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য কিংবা কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত করার জন্য নয়।’
শনিবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে’ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির সমালোচনা করে বললেন, ‘দলটি জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।’ তিনি বিএনপির প্রতি ‘ভুল সংশোধন করে জনগণের কাতারে আসার’ আহ্বান জানান। তার দাবি, ‘জনগণকে অসম্মান করার পরিণতি অতীতেও দেখা গেছে, এরপরও শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতেও হবে না।’
খুলনার জনগণের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনে জনগণ যে রায় দিয়েছেন, তা সংসদে বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের। তার অভিযোগ, ‘চুরি, ডাকাতি ও ইঞ্জিনিয়ারিং করে’ ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সংসদে তারা ‘সিংহের মতো লড়াই’ চালিয়ে যাবেন বলে জানান।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, ‘সংসদে দাবি আদায় সম্ভব না হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাঠ থেকেই আন্দোলন গড়ে উঠবে।’ তবে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা চান না উল্লেখ করে তার দাবি, গৃহযুদ্ধ এড়াতেই তারা নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছেন।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে সরকার মাথা নত করলে তারা তারও বিরোধিতা করবেন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘পুশিংয়ের’ মাধ্যমে নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি জনগণও দেশের পক্ষে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের লক্ষ্য বৈষম্য, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে রাজনৈতিক কৌশল ও ষড়যন্ত্রের কারণে জনগণের প্রত্যাশার সরকার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার দাবি, ইসলামী মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও সুশাসনের কথা বললে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উগ্রবাদী বা মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়ে বিএনপি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তার দাবি, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের পথ বন্ধ করা এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সনদের বাস্তবায়নে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি বললেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারীর মত, জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পরও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, তরুণদের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তিনি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী বললেন, রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করাই এখন দেশের তিনটি বড় লড়াই। তিনি বিএনপিরও সমালোচনা করেন, ‘গণতন্ত্র ও সংস্কারের প্রশ্নে দলটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।’ খুলনাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) যুগ্ম সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোবারক হোসাইন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি।
সমাবেশে খুলনা বিভাগ থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর ২৫ জন সংসদ সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।