সব মানুষেরই একটি ঠিকানা থাকে। কিন্তু সাংবাদিকদের ঠিকানা কখনো স্থির থাকে না। আজ নদীর চর, কাল সমুদ্রের উপকূল, পরশু ভাসমান হাটে। কখনো ভাঙন, কখনো বন্যা, কখনো রাজনীতি, কখনো মানুষের কান্না। এই ভ্রাম্যমাণ জীবনই যেন তাঁদের স্থায়ী নিবাস।
বরিশালের সংবাদকর্মী জুয়েল সরকারের জীবনও তেমনই।
তিন দশক ধরে তিনি পথেই আছেন। সংবাদ খুঁজতে খুঁজতে এক জেলা থেকে আরেক জেলা, এক জনপদ থেকে আরেক জনপদ। শহরের আরামদায়ক স্টুডিওর চেয়ে তাঁর বেশি পরিচিত কাদামাখা মেঠোপথ, ভাঙা বাঁশের সাঁকো, উত্তাল নদী আর প্রত্যন্ত গ্রামের উঠোন।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের হাত ধরে শুরু হয় তাঁর সংবাদজীবন। তখন টেলিভিশন সংবাদ ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, প্রযুক্তিও ছিল সীমিত।
কিন্তু খবরের প্রতি কৌতূহল ছিল সীমাহীন। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর নোটবুক নিয়ে ছুটে বেড়ানো সেই তরুণ সাংবাদিক খুব দ্রুতই বুঝে যান, সংবাদ কেবল ঘটনা নয়, মানুষের জীবনও।
২০০১ সালে তিনি যোগ দেন চ্যানেল আইয়ে। তখন দেশের বেসরকারি টেলিভিশন নতুন এক যুগের সূচনা করছে। প্রতিযোগিতা বাড়ছে, বাড়ছে সংবাদ সংগ্রহের গতি। সেই সময়েও জুয়েল সরকার নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন মাঠের রিপোর্টার হিসেবে।
২০০৫ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বাংলাভিশন। তারপর ২০০৬ সালে চ্যানেল ওয়ান। যেন নদী নতুন মোহনা খুঁজে পেল। প্রতিদিনের সংবাদ সংগ্রহের ভিড়ে তিনি বুঝতে শিখলেন, সবচেয়ে বড় খবর অনেক সময় রাজধানীতে নয়, লুকিয়ে থাকে গ্রামের কোনো নিভৃত উঠোনে।
২০১১ সালে শুরু হয় ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দীর্ঘ অধ্যায়। প্রায় এক দশক ধরে তিনি ঘুরেছেন দেশের প্রান্ত থেকে প্রান্তে। চরাঞ্চলের জেলে, উপকূলের কৃষক, ঘূর্ণিঝড়ে ঘরহারা পরিবার, নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ কিংবা কোনো স্কুলশিক্ষকের নীরব সংগ্রাম, তাঁদের গল্পই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রতিবেদনের প্রাণ।
২০২২ সালে ডিবিসি নিউজে যোগ দিয়ে আরও একবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পরিবেশনের ভাষা বদলেছে, দর্শকের অভ্যাস বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি তাঁর বিশ্বাস, সাংবাদিকতা মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
তারপর ২০২৬ সালে আবার চ্যানেল ওয়ানে ফেরা। আজ শনিবার ১লা আগষ্ট অনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন চ্যানেল ওয়ানে। এই ফিরে আসা কেবল চাকরি বদলের ঘটনা নয়। এটি যেন দীর্ঘদিন পর নিজের আঙিনায় ফিরে আসা। যেখানে একদিন স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে আরেকটি অধ্যায় শুরু।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অসংখ্য সরকার দেখেছেন, অসংখ্য নির্বাচন দেখেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছেন, মানুষের জয় পরাজয় দেখেছেন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে ক্যামেরা, বদলেছে সম্প্রচার প্রযুক্তি, বদলেছে নিউজরুমের ভাষা।
কিন্তু বদলায়নি তাঁর একটাই অভ্যাস, খবরের গন্ধ পেলেই বেরিয়ে পড়া।
জুয়েল সরকার জানেন, সংবাদ কেবল ক্যামেরায় ধারণ করা কিছু দৃশ্য নয়। সংবাদ মানে মানুষের হাসি, কান্না, ক্ষোভ, বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাই তাঁর কাছে প্রত্যন্ত গ্রামের নামহীন মানুষও জাতীয় সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
তিন দশকের এই পথচলায় তিনি বুঝেছেন, একজন সাংবাদিকের পরিচয় কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। তাঁর আসল পরিচয় মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অর্জন করতেই তিনি এখনও ক্যামেরা কাঁধে তুলে নেন, এখনও নতুন কোনো গ্রামের পথে হাঁটেন।
এখনও তিনি মনে করেন, সবচেয়ে বড় সংবাদটি হয়তো অপেক্ষা করছে পরের বাঁকে।
সংবাদ শেষ হয়, সম্প্রচার শেষ হয়, দিনের ব্যস্ততা থেমে যায়। হয়তো এ কারণেই জুয়েল সরকারের গল্প শেষ হয় না।
কারণ একজন মাঠের সাংবাদিকের পথচলা থামে না। তিনি আবার বেরিয়ে পড়েন। কারণ তাঁর কাছে পথই কর্মক্ষেত্র, মানুষই সংবাদ, আর সত্যের অনুসন্ধানই জীবনের সবচেয়ে বড় ঠিকানা। সেই কঠিনের সঙ্গে গাটছাড়া বেধেছেন জুয়েল সরকার।
অভিনন্দন জুয়েল কাকা…