,

জলাতঙ্ক টিকার সংকটে দেশজুড়ে ভোগান্তি!

অনলাইন ডেক্স ।। বিড়ালে আঁচড় কাটার পর গাজীপুরের একটি হাসপাতালে টিকা নিতে গিয়েছিলেন মিনার আক্তার (৩২)। সেখানে জলাতঙ্কের টিকা না পেয়ে ঢাকা পর্যন্ত এসে মহানগরের..

অনলাইন ডেক্স ।।

বিড়ালে আঁচড় কাটার পর গাজীপুরের একটি হাসপাতালে টিকা নিতে গিয়েছিলেন মিনার আক্তার (৩২)। সেখানে জলাতঙ্কের টিকা না পেয়ে ঢাকা পর্যন্ত এসে মহানগরের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গতকাল সোমবার টিকা নেন তিনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাতঙ্কের টিকা না পেয়ে মিনার আক্তারের মতো অনেকে ঢাকায় আসছেন এই টিকা নিতে। দেশে গত বছর জলাতঙ্কে মারা গেছে ৬১ জন। চলতি বছরের ৯ মে পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।

কিছুদিন আগে খোদ ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও জলাতঙ্কের টিকার সংকট ছিল। এখন সেখানে টিকা পাওয়া যাচ্ছে। তবে জেলা পর্যায়ে অভাব রয়ে গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারিভাবে টিকার জোগান না থাকার ঢাকার বাইরে সংকট রয়েছে। ১১ মে (গতকাল) থেকে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে ৯ লাখ টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক রোগ। কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি, বানর ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং আক্রান্ত প্রাণীটি সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড়ালে সেই মানুষ কিংবা গবাদিপশুও এ রোগে আক্রান্ত হয়। দেশে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগই হয় কুকুরের কামড়ে।

আক্রান্ত রোগী পানি দেখে বা পানির কথা মনে পড়লেই প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তাই এই রোগের নাম জলাতঙ্ক। ভাইরাসবাহী প্রাণীর কামড়ানোর ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে বা কখনো কিছু আগে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সারা দেশে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ জলাতঙ্কের টিকার চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ না থাকায় ঢাকার বাইরে এই টিকার সংকট রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, সরকারিভাবে চলতি সপ্তাহ থেকে ৯ লাখ টিকা সরবরাহ করা শুরু হবে।

রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার সংকট রয়েছে; বিশেষ করে উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় টিকা না থাকায় অনেকে এই টিকা নিতে ঢাকায় আসছে।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রোগীদের প্রতিদিন প্রায় ৭০০ জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি টিকা না থাকায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের ব্যবস্থাপনায় এই টিকা কেনা হয়েছে। সরকার আমাদের কাছে টিকার চাহিদা চেয়েছে।’

পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত ৬ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে গত বুধবার খুলনা জেনারেল হাসপাতালে যান মা আয়শা বেগম। ওই হাসপাতালে গিয়ে টিকা পাননি তিনি। আয়শা সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি হাসপাতালে টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে টিকা কিনে মেয়েকে দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, জলাতঙ্কের টিকা পর্যাপ্ত না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় টিকা কিনতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর থেকে টিকার জোগান বাড়ছে।

টিকার সংকটের কথা স্বীকার করে বরিশালের সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে আমরা চেষ্টা করছিলাম একটা ওষুধ কোম্পানি থেকে টিকা কিনতে। তবে তারা টিকা দিতে পারেনি। এক সপ্তাহের মধ্যে এই সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি।’

চট্টগ্রামে বছরে ৫০ হাজার জলাতঙ্কের টিকার চাহিদা রয়েছে। সে তুলনায় টিকা কম রয়েছে বলে জানান চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সাল থেকে জলাতঙ্ক টিকার সংকট রয়েছে। আমাদের কাছে টিকা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।’ রাজশাহীর সিভিল সার্জন এস আই এম রাজিউল করিম জানান, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাঁরা টিকা মজুত রেখেছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই টিকার সংকট থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি।

হামের মতো এখানেও ‘ওপি’র সমস্যা

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতের অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাতঙ্কের টিকারও সংকট দেখা দিয়েছে। আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হতো। তবে ওপি স্থগিত হওয়ার পর টিকার সংকট শুরু হয়। ক্রমে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় সংকট প্রবল হয়ে উঠেছে।

ওপি কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাতঙ্কের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘যখন ওপি ছিল, প্রতিবছর কত লাখ মানুষকে কুকুর-বিড়াল কামড় বা আঁচড় দেয় এবং কত টিকা লাগবে, সেটার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হতো। সেই হারে টিকা সরবরাহ করা হতো। ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত টিকা সরবরাহ করা হয়েছিল। ওপি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ওই টিকা আর কেনা যায়নি।’

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আক্রান্ত মানুষ ছাড়াও পোষা ও অ-পোষা সব বিড়াল-কুকুরকে আগেই জলাতঙ্কের টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, সরকারিভাবে জোগান না থাকলে অনেক মানুষের জন্যই বাইরে থেকে কিনে টিকা নেওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, ‘কুকুরকে টিকা না দেওয়ার ফলে জলাতঙ্ক বেড়ে যাবে। প্রতিবছর কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দেয় প্রায় ৫ লাখ মানুষকে। কুকুরকে টিকা দিলে জলাতঙ্ক কমে আসে। এখন যেহেতু কুকুরকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না, তাতে কুকুরের জলাতঙ্ক বাড়বে। আর কুকুরের জলাতঙ্ক বাড়লে মানুষেরও জলাতঙ্ক বাড়বে। অর্থাৎ জলাতঙ্কে মৃত্যুর হার বাড়বে।’

জলাতঙ্কের টিকার সংকটের কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এটা আমরা মোকাবিলা করেছি। ঢাকার বাইরে জলাতঙ্ক টিকা সরবরাহ করা হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About the Author

Easy WordPress Websites Builder: Versatile Demos for Blogs, News, eCommerce and More – One-Click Import, No Coding! 1000+ Ready-made Templates for Stunning Newspaper, Magazine, Blog, and Publishing Websites.

BlockSpare — News, Magazine and Blog Addons for (Gutenberg) Block Editor

Search the Archives

Access over the years of investigative journalism and breaking reports