শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন
Logo

সারস্বত বালিকা বিদ্যালয়ে গাছ কর্তন, জানে না কর্তৃপক্ষ

/ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

সরকার ঘোষণা করেছে ‘আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে।’ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবুজ বনায়ন রক্ষায় গাছ কাটা বন্ধ রাখতে হবে। তাই গাছ লাগানো নিয়ে বর্তমান সরকার যেখানে হার্ড লাইনে ঠিক সেসময় বরিশাল নগরীর জগদীশ সারস্বত বালিকা মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের মাঠ থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে গাছ।
জানেনা বিদ্যালয় কতৃপক্ষ। জানা যায়,
নগরীর জগদীশ সারস্বত বালিকা মাধয়মিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের মাঠ থেকে রাতের আঁধারে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী প্রধান শিক্ষক কাওসার হোসেনসহ কয়েকজন শিক্ষক ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে। দুইমাস আগে চারটি এবং গত ২৩ অক্টোবর আরও দুটি লক্ষাধিক টাকা মূল্যের বড় গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী। অথচ এসব গাছ কাটার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব নুরুল আমীন। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।

শনিবার দুপুরে নগরীর কালীবাড়ি রোডস্থ সারস্বত বালিকা মাধয়মিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ সরেজমিনে পরিদর্শনকালে এসব তথ্য পাওয়া যায়। প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন জানান, তিনি গত দুই বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ শাখা চালু না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম এখনো মূলত বিদ্যালয় শাখাকেন্দ্রিক।

এলাকাবাসী বা কালীবাড়ি রোডের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই বিদ্যালয় ভবনের চারপাশে একসময় মেহগনি, চাম্বল ও শিশু গাছের সমৃদ্ধ বাগান ছিল। পুকুরসহ ফুলের বাগানও ছিলো। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরীর ভাষ্য অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণির কক্ষের সামনে চারটি চাম্বল, একটি মেহগনি ও একটি শিশু গাছ বেশ বড় ও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে প্রথম দফায় চারটি এবং সর্বশেষ আরও দুটি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের বিপরীত পাশের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার বাসার বারান্দা থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ পরিষ্কার দেখা যায়। দুইমাস আগে বেশ কয়েকটি গাছ কাটতে দেখে ভেবেছিলাম, হয়তো স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রয়োজনে গাছগুলো কাটছে। ঢাকায় যাওয়ার তাড়া থাকায় তখন এ নিয়ে কিছু বলিনি। কিন্তু গত শুক্রবার রাতে দুটি মোটা ও দামি গাছ কাটা হয়েছে, শনিবার সকালে তা নিয়ে যেতে দেখে ছুটে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি। প্রধান শিক্ষক বা কমিটির কাউকে খুঁজে না পাওয়ায় তাদের আটকাতে পারিনি।’

বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী সুদ্বীপ এর অভিযোগ, রাতে গাছগুলো কেটে রেখে পরদিন সকালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সকালে বিদ্যালয়ের গেট খুলতে দেরি হওয়ায় সহকারী প্রধান শিক্ষক কাওসার হোসেন তাকে গালাগালি করেন বলেও দাবি করেন নৈশপ্রহরী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে বিদ্যালয় ভবনের বিভিন্ন কক্ষে দিনের বেলাতেও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ধারণা, রাতে গাছ কাটার সময় আলোর প্রয়োজন হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে রাতের বেলায় ঠিক কীভাবে গাছ কাটা হয়েছে এবং কারা এতে জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘দুই মাস আগে কাটা চারটি গাছের মধ্যে দুটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে সেগুলো কাটা হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ যে দুটি গাছ কাটা হয়েছে, সেগুলো আমরা কাটিনি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
সর্বশেষ গাছ কাটার বিষয়ে কে জানেন, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষক ও নৈশপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি আরও জানান, বিষয়টি জানার পর জরুরি ভিত্তিতে ম্যানেজিং কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নুরুল আমীন বলেন, আগে কিংবা পরে কোনো গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিষয়টি নিয়ে জরুরি সভা ডাকা হয়েছে।এদিকে স্কুলের ভিডিও ফুটেজ দেখতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বিষয়টি এড়িয়ে জান।

অন্যদিকে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক কাওসার হোসেন সরে যান বলে সরেজমিনে উপস্থিত সাংবাদিকদের দাবি। পরে তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে গাছ কাটার অনুমোদন, গাছগুলোর কাঠ কোথায় নেওয়া হয়েছে এবং এর অর্থ বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।

এদিকে ১৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এ্যাড. শাহ আমিনুল ইসলাম বলেন, দিনে ও রাতে স্কুলের গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে আর প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কিছুই জানেন না, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। তিনি বলেন, প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করলেই বেড়িয়ে আসবে কারা কারা এর সাথে জড়িত ।

এ বিষয়ে বরিশাল বন বিভাগের কর্মকর্তা জাকিরুল হক সরকার বলেন, ‘এজন্য আমাদের নোটিশ করলে আমরা দর ও মার্ক করে দেই।’ অর্থাৎ গাছ কাটার ক্ষেত্রে বন বিভাগের নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। তবে আলোচ্য গাছগুলোর ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি বনবিভাগ বরিশালের পরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জগদীশ সারস্বত বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের কোনো আবেদন পেয়েছি বলে মনে পড়ে না, রবিবার অফিস চলাকালীন সময়ে নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারবেন বলে জানান তিনি।
১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে জগদীশ বাবুর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বরিশালের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এক একরের বেশি আয়তনের প্রায় ১০৪ শতাংশ জমিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ একসময় বড় বড় গাছ ও পুকুরের কারণে মনোরম ছিল বলে প্রবীণ বাসিন্দারা জানান। তাদের দাবি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে গেছে। একসময় বড় গাছের বাগান ও পুকুর থাকলেও এখন তার অনেক কিছুই আর আগের অবস্থায় নেই।

বিদ্যালয়টির সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত সংবাদে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরের শতবর্ষী পুকুর ভরাটের অভিযোগ ওঠে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাতের আঁধারে বালুমাটি ফেলে পুকুর ভরাট করা হচ্ছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের হস্তক্ষেপের পর ভরাটের কাজ বন্ধ এবং পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। পুকুর ভরাটের ঘটনায় সে সময় বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্র বিজয় ভট্টাচার্য সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন সদস্যের দাবি, গাছ কাটার অনুমোদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আগের কমিটির সময়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব দাবির পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি।

এবিষয় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব নুরুল আমীন বলেন, গাছ কাঁটার বিষয়টি আমি শুনেছি। বিদ্যালয়ের কাজের দায়িত্বে রয়েছে বরিশালের জেলাপ্রশাসক। আমি প্রধান শিক্ষককে স্কুলের ভিডিও ফুটেজ দেখে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিতে বলছি। তিনি আরও বলেন, যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছে গাছ লাগাতে। সেখানে গাছ কাটার প্রশ্নই ওঠে না। যারা এই কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com