অনলাইন ডেক্স ।।
বরিশালে চালের বাজারে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধি ও চিকন চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে পোলাও-বিরিয়ানির প্রধান উপকরণ চিনিগুঁড়া চাল। ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি, করপোরেট পর্যায়ে ধান-চাল মজুদ এবং সরবরাহ সঙ্কট এই তিন কারণেই বাজারে দাম বেড়েছে। তবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
এদিকে চালের দোকানে দাঁড়িয়ে পোলাও চালের দাম শুনেই চুপ করে গেলেন গৃহিণী রেহানা বেগম। তিন কেজি পোলাও চাল হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখলেন। পরে এক কেজি চাল কিনে বাজার শেষ করলেন। বের হওয়ার সময় বললেন, ‘আগে মাসে এক-দুইবার পোলাও রান্না হতো। এখন দাম এত বেড়েছে যে বিশেষ দিন ছাড়া কেনার সাহসই হয় না।’
বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাস আগেও ৫০ কেজির একটি বস্তা চিনিগুঁড়া চালের দাম ছিল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমানে একই বস্তা বিক্রি হচ্ছে আট হাজার ৬০০ থেকে আট হাজার ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় তিন হাজার ৭০০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়, যা আগে ছিল প্রায় ১১০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রফতানির জন্য বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল সংগ্রহ করায় বাজারে বিকল্প হিসেবে কাটারি, নাজিরশাইল, মিনিকেটসহ অন্যান্য চিকন চালের চাহিদাও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো চিকন চালের বাজারে। ফলে বিয়ে, দাওয়াত কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় চাল কিনতে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) বরিশালের কাঁচাবাজারে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
বাজারে আসা অনেক ক্রেতাই বলছেন, দৈনন্দিন খাবারের জন্য মোটা চাল কিনলেও সুগন্ধি বা পোলাও চাল এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আবুল সত্তার বলেন, ‘সুগন্ধি চাল এখন আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, বিলাসিতার মতো হয়ে গেছে। আগে মাসে কয়েকবার রান্না হতো, এখন ঈদ বা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া কেনা হয় না।’
এদিকে বরিশালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মানভেদে সুগন্ধি চালের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। কয়েকটি উন্নত মানের চালের দাম আরও বেশি। অন্যদিকে সাধারণ মোটা চাল ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা এবং মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, গত কয়েক সপ্তাহে বিশেষ করে চিকন ও সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ক্রেতাদের মতে, বাজারে একটির পর একটি পণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের বাজেট নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। যেসব খাবার একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বাভাবিক ছিল, সেগুলোও এখন ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, বাসায় ছোট ছেলের জন্মদিন সামনে। ভাবছিলাম পোলাও রান্না করব। কিন্তু চালের দাম শুনে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি। এখন শুধু সাধারণ ভাত রান্না করলেই খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
একই বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আগে অতিথি এলেই পোলাও রান্না করতাম। এখন সেই চাল কিনতে গেলেই দুই শতাধিকের বেশি টাকা গুনতে হয়। তাই বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া আর কেনা হয় না।’
চালের দোকানদার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিকন ও সুগন্ধি চালের দাম। মিল থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ও অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারে আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে গরিব ও মধ্যবিত্তদের প্রধান আমিষের উৎস মুরগি, ডিম ও দুধের দাম আবারও বেড়েছে কয়েক গুন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সোনালী মুরগির দামও বেশি। একইসঙ্গে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়, আর প্রতি লিটার দুধের দাম পৌঁছেছে ১১০ টাকায়। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা মেটানো আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
মুরগি ও ডিম বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে মুরগি ও ডিমের সরবরাহ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে বাজারে বেশির ভাগ সবজি ও মাছের দাম বাড়তি। এতে ডিম ও মুরগির চাহিদা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
বাংলা বাজারের একাধিক বিক্রেতা বলেন, এখন পর্যন্ত ভারতীয় মরিচ আসতে শুরু করে নাই। তাই বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম একটু বেশি। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে অন্যান্য অনেক পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। পাইকারি পর্যায়েও এসব পণ্যের দাম বেশি হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম কমানোর সুযোগ নেই। বৃষ্টি এভাবে চলতে থাকলে দাম আরো বাড়বে।
শসার দাম ৮০ থেকে ১১০ টাকা। কাঁচা পেঁপে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ধুন্দল, ঝিঙা ও চিচিঙার দাম বাজারভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা। এ ছাড়া কচুর লতি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পটোল ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং করলা ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে প্রতি পিস চালকুমড়া ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং দেশি লাউ ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে পেঁয়াজের দাম এখনও চড়া। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। আলুর দামে অবশ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি; কেজি ২৫/ ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের দাম বাড়লেও ব্রয়লার মুরগির বাজারে গত এক সপ্তাহে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে পরিস্থিতি আরও চড়া। পুকুরে চাষ করা পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল ও পোয়া মাছের দাম গত এক সপ্তাহে কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মানভেদে চিংড়ি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা, পাবদা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, মাঝারি রুই ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকা।অন্যদিকে রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে এক হাজার টাকার বেশি।
মাছ বিক্রেতা শিমুল বলেন, চারিদিকে পানি উঠে যাওয়ায় বাজারে মাছের সরবরাহ কম। তাই দাম একটু বেশি । তবে কিছু মাছের দাম এমনিতেই বেশি। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে চাষের মাছের দামও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বেশি দামে মাছ কিনতে হওয়ায় তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পোটরোড বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক ক্রেতা বলেন, বরিশালে কাঁচামরিচের দাম কমেনি। কিন্তু ডিম, সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন অনেক বেশি। ফলে দু-একটি পণ্যের দাম হাতের নাগালে থাকলেও পুরো বাজারের ব্যয়ে তেমন স্বস্তি মিলছে না। বাজারের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে সাধারণ মানুষকে এখন অনেক খাবারের স্বাদ ভুলে যেতে হবে।